সুদানের দক্ষিণ কোরদোফান অঙ্গরাজ্যের কালোজি শহরে একটি কিন্ডারগার্টেনসহ একাধিক স্থানে র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (RSF)–এর হামলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৪৭ এ দাঁড়িয়েছে—যাদের অধিকাংশই শিশু। আরও প্রায় ৫০ জন আহত হয়েছে বলে সরকারপন্থী সুদানি সশস্ত্র বাহিনীর (SAF)।
সুদানের দুটি সামরিক সূত্রের বরাতে এ খবর জানিয়েছে সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরা।
সূত্রগুলো জানায়, আরএসএফ বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) প্রথমে কিন্ডারগার্টেনে হামলা চালায় এবং পরে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আহতদের সাহায্য করতে জড়ো হওয়া বেসামরিক মানুষের ওপর ফের আঘাত হানে। শহরের হাসপাতাল এবং একটি সরকারি ভবনেও হামলা চালানো হয়।
সূত্রগুলো বলছে, বহু আহতের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
বৃহস্পতিবার সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক প্রথমে জানায়, কালোজিতে অন্তত নয়জন নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে চার শিশু ও দুই নারী রয়েছে। তাদের ভাষায়, আরএসএফ ও তাদের মিত্র সুদান পিপলস লিবারেশন মুভমেন্ট–নর্থ (আল-হিলু) “কিন্ডারগার্টেন ও বেশ কয়েকটি বেসামরিক স্থাপনায় ইচ্ছাকৃত আত্মঘাতী ড্রোন হামলা” চালিয়েছে।
তারা আরও বলেছে, এই হামলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং বেসামরিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা টার্গেট করার ধারাবাহিকতার অংশ।
আরও পড়ুন: সুদানে গৃহযুদ্ধ কেন? মিসর-আরব আমিরাতের ভূমিকা কী
এটি চলমান বিপর্যয়কর গৃহযুদ্ধে বেসামরিকদের ওপর আরএসএফের বর্বরতার সর্বশেষ উদাহরণ। এই যুদ্ধে প্রতিপক্ষ সুদানের সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধেও অত্যাচারের বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।
বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, কোরদোফান অঞ্চল আরও এক দফা ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের মুখোমুখি হতে পারে, কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তীব্র লড়াই মানবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক বলেন, গত মাসে উত্তর দারফুরের রাজধানী এল-ফাশের পতনের পর যেভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সতর্কবার্তা অগ্রাহ্য করেছিল এবং তারপর ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ঘটে, কোরদোফানেও “ইতিহাস যেন পুনরাবৃত্ত হচ্ছে”।
তিনি বলেন, “এল-ফাশেরে ভয়াবহ ঘটনার এত দ্রুত পুনরাবৃত্তি কোরদোফানে দেখা সত্যিই হতবাক করার মতো।” তিনি বিশ্বশক্তিগুলোকে আহ্বান জানান, যেন এই অঞ্চলও একই পরিণতির শিকার না হয়।
অক্টোবরের শেষ দিক থেকে, যখন আরএসএফ উত্তর কোরদোফানের বারা শহর দখল করে, জাতিসংঘ অন্তত ২৬৯ বেসামরিক মানুষের নিহত হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত করেছে—বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ এবং সরাসরি হত্যাকাণ্ডে।
পুরো অঞ্চলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। বিভিন্ন স্থানে প্রতিশোধমূলক হামলা, নির্বিচার আটক, যৌন সহিংসতা এবং শিশুদের জোরপূর্বক যুদ্ধে নিয়োগের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এ সপ্তাহের শুরুর দিকে আরএসএফ পশ্চিম কোরদোফানের বাবনুসা শহর নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করে। প্রচারিত ভিডিওতে তাদের যোদ্ধাদের স্থানীয় সামরিক ঘাঁটিতে বিচরণ করতে দেখা যায়। তবে সেনাবাহিনী শহর পতনের খবর অস্বীকার করেছে।
এল-ফাশের পতনের পর এখন দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত হয়েছে মধ্য সুদানের কোরদোফানে, যা দারফুরে সুদানের সেনাবাহিনী ও তার মিত্রদের নিয়ন্ত্রণাধীন শেষ প্রধান শহর ছিল।
কোরদোফানের কৌশলগত অবস্থান দুই পক্ষের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অঞ্চলটি পশ্চিমে আরএসএফ নিয়ন্ত্রিত দারফুর এবং পূর্ব–উত্তরে সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকা—এই দুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থান করছে, যা যুদ্ধরত পক্ষগুলোর শক্তঘাঁটিকে সংযুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ করিডর হিসেবে কাজ করে।
এল-ওবেইদের মতো বড় শহরগুলোর নিয়ন্ত্রণ পেলে আরএসএফ রাজধানী খার্তুমের দিকে সরাসরি অগ্রসর হওয়ার পথ পেয়ে যাবে। খার্তুম এ বছর শুরুর দিকে সরকার বাহিনী পুনর্দখল করেছিল।
এল-ফাশের পতনের আগেই জাতিসংঘ সম্ভাব্য নৃশংসতার ব্যাপারে জরুরি সতর্কতা দিয়েছিল, যা বেশিরভাগই উপেক্ষিত হয়। শহর দখলের পর ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ঘটে—স্যাটেলাইট চিত্রেও লাশের স্তূপ দেখা যায়। জাতিসংঘ প্রধান আন্তোনিও গুতেরেস এটিকে “একটি অপরাধস্থল” বলে বর্ণনা করেন।
পরবর্তীতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল যুদ্ধাপরাধ তদন্তের আহ্বান জানায় এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন আরএসএফের উপপ্রধান ও দলটির প্রধান মোহাম্মদ হামদান “হেমেতি” দাগালোর ভাই আব্দেলরহিম দাগালোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/