রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তার দুই দিনের ভারত সফর শেষ করেছেন। ইতোমধ্যে এ সফরের নানান বিষয় সংবাদের শিরোনামে উঠে এসেছে। গত কয়েক দশক ধরেই ভারতের সঙ্গে পশ্চিমের বিরুদ্ধের সবচেয়ে শক্তিশালী পক্ষ রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তাই সব কিছু ছাপিয়ে এই সফরে ভারত-রাশিয়া একে অপরের কাছ থেকে কী পেল সেটিই এখন মূখ্য বিষয়।
অনেকেই বলছেন এই সফরে পুতিন বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল বৃহৎ অর্থিনীতির দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা রক্ষা করার প্রতীকী জয় পেয়েছেন। আর সুদূরপ্রসারী বাণিজ্যিক লক্ষ্য নিয়ে বিকল্প বাজার খোঁজার সুযোগ পেয়েছে ভারত।
৮ শতাংশের বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভারত বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বড় অর্থনীতির দেশ। এসব কারণে রাশিয়ার পণ্য ও সম্পদ, বিশেষ করে তেলের জন্য ভারত অত্যন্ত আকর্ষণীয় বাজারে পরিণত হয়েছে। ভারত এখন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেলের ভোক্তা।
দেশটি বিপুল পরিমাণ তেল কিনছে এখন রাশিয়া থেকে। ইউক্রেনে আক্রমণের আগে ভারতের রাশিয়া থেকে মোট তেল আমদানির ২.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৫ শতাংশে উঠেছে। কারণ, মস্কোর ওপর পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার ফলে কম দামে তেল পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে ভারত। ইউরোপের বাজারে রাশিয়ার প্রবেশ সীমিত হয়ে পড়েছে।
প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ভারত আরও উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এস-৫০০, পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার জেট সু-৫৭ কিনছে। পাকিস্তান যে চীনের তৈরি পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ ফাইটার জে-৩৫ কিনেছে, তা দিল্লির নজর এড়ায়নি এবং সম্ভব হলে সমতুল্য জেট ভারত দ্রুত নিশ্চিত করতে চাইবে।
তবে এই সফরে চুক্তির তালিকা অবশ্য ততটা দীর্ঘ নয়। তবু দুই দেশ তাদের ‘বিশেষ ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কৌশলগত অংশীদারত্ব’ বজায় রাখার মতো কয়েকটি সমঝোতা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, রাশিয়া-ভারত অর্থনৈতিক সহযোগিতা কর্মসূচি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও সাপ্লাই চেইনসংক্রান্ত সমঝোতা, পাশাপাশি রাশিয়ার কালুগা অঞ্চলে একটি যৌথ ফার্মাসিউটিক্যাল কারখানা নির্মাণের ঘোষণা।
এছাড়া, তেল ও প্রতিরক্ষায় বড় ঘোষণা নেই। পুতিন ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, ভারতকে ‘নিরবচ্ছিন্ন’ জ্বালানি সরবরাহ করতে প্রস্তুত মস্কো। কিন্তু নতুন পরিমাণ বা শর্ত ঘোষণা হয়নি। ট্রাম্পের ৫০ শতাংশ শুল্কের চাপে ভারত রুশ তেল আমদানি কমিয়েছে। এখন বল ভারতের কোর্টে।
কোনও বড় চুক্তি হয়নি প্রতিরক্ষা খাতেও। এসইউ-৫৭ যুদ্ধবিমান কেনা কিংবা অতিরিক্ত এস-৪০০ নিয়ে কোনও ঘোষণা আসেনি। এস-৪০০-এর বাকি ইউনিটের ডেলিভারি দেরি হচ্ছে, তাও প্রকাশ্যে তোলা হয়নি।
পুতিনের পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ জানান, মোদি-পুতিনের রুদ্ধদ্বার মুখোমুখি বৈঠকই ছিল সফরের মূল পর্ব। এখানেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুর স্পর্শকাতর আলোচনা হয়েছে বলে তিনি জানান।
নেতাদের বিবৃতিতে যা সবচেয়ে স্পষ্ট তা হলো, এই সফরের কেন্দ্রে ছিল বাণিজ্য। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্কে চাপে থাকা ভারত দুই দেশই বিকল্প বাজার খুঁজছে।
দু’দেশের বর্তমান বাণিজ্য ৬৮.৭২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২০ সালের ৮.১ বিলিয়ন ডলার থেকে দ্রুত বেড়েছে। আর তা ঘটেছে মূলত রুশ ডিসকাউন্টেড তেল কেনার কারণে। রাশিয়া চাইছে এই প্রবাহ বজায় থাকুক। পুতিনের ‘নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ’ মন্তব্য মূলত দিল্লির সিদ্ধান্তগ্রহণে এক ধরনের ইঙ্গিত।
মোদির বক্তব্যেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধির ওপর জোর ছিল। দুই দেশ ১০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য লক্ষ্যমাত্রা ধরে পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক কাঠামোতে স্বাক্ষর করেছে। এছাড়া জাহাজ নির্মাণ, নাবিক প্রশিক্ষণ, নতুন শিপিং লেন, অসামরিক পারমাণবিক জ্বালানি, ভিসামুক্ত ভ্রমণ, গুরুত্বপূর্ণ খনিজসহ বহু সমঝোতা হয়েছে।
মোদি উল্লেখ করেছেন ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়ন (ইএইইউ)-এর সঙ্গে সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির অগ্রগতির বিষয়টি। এটি হলে রাশিয়া-ভারতসহ সদস্য দেশগুলো নতুন বাজারে প্রবেশাধিকার পাবে।
তাছাড়া দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক অব্যাহতই থাকবে। যদিও এসআই-৫৭ ফিফথ জেনারেশন যুদ্ধবিমান কেনা নিয়ে ভারত প্রকাশ্যে কিছু বলেনি। বরং ভারতের দাবির কেন্দ্রবিন্দু ছিল চলমান প্রতিরক্ষা প্রকল্পের সময়মতো সরবরাহ। বিশেষত এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বাকি ইউনিট, যার ডেলিভারি দেরিতে চলছে।
সুলতানা দিনা/