ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অপহরণের পর দেশটির তেল খাত নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে ভেনেজুয়েলায়।
হামলার পর শনিবার এক জনসমাবেশে দেওয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পেলে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প অনেক টাকা আয় করতে পারবে। আমরা ভেনেজুয়েলার তেল অবকাঠামো পুনর্গঠন করব, যার খরচ হবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। এই অর্থ সরাসরি আমাদের তেল কোম্পানিগুলোই দেবে। আর আমরা তেল উৎপাদন ও প্রবাহকে ঠিক যেভাবে হওয়া উচিত, সেভাবেই ফিরিয়ে আনব।’
ট্রাম্পকে যখন সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করেন, ভেনেজুয়েলায় রাশিয়া, চীন ও ইরানের স্বার্থ আছে, এখন তাদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ককে কীভাবে প্রভাবিত করবে? ট্রাম্প বলেন, ‘যেসব দেশ তেল চায়, যুক্তরাষ্ট্র তাদের কাছে তেল বিক্রি করবে। আমরা তেলের ব্যবসায় আছি। আমরা তাদের কাছে তেল বিক্রি করব।’
নতুন করে আলোচনায় আসা ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প সম্পর্কে যা জানা দরকার
ভেনেজুয়েলা কত তেল উৎপাদন করে?
পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থা ওপেকের সদস্য ভেনেজুয়েলা হলেও শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর তুলনায় তাদের উৎপাদন তুলনামূলকভাবে কম। ওপেকের তথ্য অনুযায়ী, দেশটি প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে, যা বৈশ্বিক মোট উৎপাদনের ১ শতাংশেরও কম।
২০০০ দশকের শুরুতে ভেনেজুয়েলার দৈনিক তেল উৎপাদন ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি ছিল। তবে বিনিয়োগ হ্রাস এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক চাপের কারণে বর্তমানে ভেনেজুয়েলা তাদের বেশির ভাগ তেল চীনে রপ্তানি করে।
তুলনামূলকভাবে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন ১ কোটি ৩৫ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে বলে জানিয়েছে এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক ও ওপেকের শীর্ষ উৎপাদক সৌদি আরব দৈনিক আনুমানিক ১ কোটি থেকে ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন করে, আর তৃতীয় অবস্থানে থাকা রাশিয়ার দৈনিক উৎপাদন ৯৪ লাখ ব্যারেল।
রাইস ইউনিভার্সিটির লাতিন আমেরিকা এনার্জি প্রোগ্রামের পরিচালক ফ্রান্সিসকো জে. মনালদি পূর্বাভাস দিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার তেল অবকাঠামো পুনর্গঠন করে দৈনিক উৎপাদন ৪০ লাখ ব্যারেলে তুলতে অন্তত এক দশক সময় লাগবে এবং এতে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে, যা দেশটির অতীতের যেকোনো সময়ের উৎপাদনমাত্রার চেয়েও বেশি। মনালদি বলেন, ‘এই মজুতের পরিমাণের সঙ্গে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল ও কানাডার মজুতের তুলনা করা যায়।’
ওপেকের তথ্য অনুযায়ী, প্রমাণিত তেল মজুতের দিক থেকে ভেনেজুয়েলার অবস্থান বিশ্বে শীর্ষে, যা ৩০৩ বিলিয়নের বেশি ব্যারেল, এটি বৈশ্বিক মোট তেল মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশ।
ভেনেজুয়েলার তেল মজুত দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সৌদি আরবের ২৬৭ বিলিয়ন ব্যারেলকেও ছাড়িয়ে গেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মজুতের চেয়ে ছয় গুণেরও বেশি। ভেনেজুয়েলার অধিকাংশ অনাবিষ্কৃত তেল রয়েছে ‘অরিনোকো বেল্ট’ নামে পরিচিত অঞ্চলে যা দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলজুড়ে প্রায় ২১ হাজার বর্গমাইল বিস্তৃত একটি এলাকায়।
ভেনেজুয়েলায় কি ইতোমধ্যেই কোনো মার্কিন তেল কোম্পানি কাজ করছে?
বর্তমানে ভেনেজুয়েলায় মাত্র একটি মার্কিন তেল কোম্পানি-শেভরন কাজ করছে। দেশটির মোট তেল উৎপাদনের প্রায় ২৫ শতাংশই আসে শেভরনের হাত ধরে। আর কোনো বড় পশ্চিমা কোম্পানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে উৎপাদনে নেই বলে উল্লেখ করেন মনালদি।
এক্সন মোবিল ও কনোকোফিলিপসসহ অন্যান্য মার্কিন জ্বালানি জায়ান্টরা ২০০৬ সাল থেকে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের উদ্যোগে বিদেশি বেসরকারি তেল স্বার্থ জাতীয়করণের পর ভেনেজুয়েলা ছেড়ে যায়।
২০০৫ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভেনেজুয়েলার ওপর একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন, যার মধ্যে তেল খাতও রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, মাদক পাচার ও সন্ত্রাস দমনে ব্যর্থতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এর পেছনে কারণ।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়, ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পেত্রোলিওস দে ভেনেজুয়েলার সম্পদ জব্দ করে এবং মার্কিন নাগরিকদের ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা করতে নিষেধ করে।
সর্বশেষে, ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার তেল খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা চারটি কোম্পানি ও তাদের সংশ্লিষ্ট তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
ডিসেম্বরের শুরুতে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হওয়া সব নিষেধাজ্ঞাভুক্ত তেল ট্যাংকারের ওপর সম্পূর্ণ ও সর্বাত্মক অবরোধ আরোপের আহ্বান জানান। এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র দুটি নিষেধাজ্ঞাভুক্ত জাহাজ জব্দ করে।
ভেনেজুয়েলায় সরকার পরিবর্তন হলে তেলের দামে কী প্রভাব পড়তে পারে?
বৈশ্বিক তেলের সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। তবে ভেনেজুয়েলার সীমিত উৎপাদনক্ষমতার কারণে তেলের দামে তাৎক্ষণিক বড় প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। ফ্যাক্টসেটের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার বিকেলের লেনদেনে তেলের দাম সামান্য কমেছে।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, প্রায় ২০ শতাংশ। আগের দুই বছরের পতনও এতে যুক্ত হয়েছে। শুক্রবারের লেনদেনে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ক্রুডের দাম নেমে আসে ব্যারেলপ্রতি ৫৭.৩২ ডলারে, যা জানুয়ারিতে প্রায় ৮০ ডলার ছিল।
এদিকে, বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলো এমন হারে বাড়ছে, যা তেলের দামে লাগাম টানতে সহায়ক—কারণ বর্তমানে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ উদ্বৃত্ত এবং শীর্ষ উৎপাদকদের উৎপাদন সক্ষমতাও যথেষ্ট।
স্বল্পমেয়াদে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ উঠে গেলে তেলের দাম কমতেও পারে বলে মনে করেন মনালদি। তিনি বলেন, ‘অবরোধের আগে ভেনেজুয়েলা প্রায় ৮ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করত। সেগুলো আবার বাজারে এলে চাপ কমবে।’
তবে দীর্ঘ সময় ধরে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন কম থাকলে কিছু জ্বালানি খরচে প্রভাব পড়তে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দেশটি এমন এক ধরনের অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে, যা ডিজেল তৈরির জন্য উপযোগী এবং ডিজেল বহু শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত।
ফলে বৈশ্বিক বাজার থেকে ভেনেজুয়েলার তেলের জোগান কমে গেলে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম বাড়তে পারে এবং মুদ্রাস্ফীতিও ত্বরান্বিত হতে পারে বলে জানিয়েছে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা নিরপেক্ষ থিঙ্ক ট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও মাদুরোর অপসারণের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়, তার ওপরই এমন বিনিয়োগ নির্ভর করবে বলে সতর্ক করেন মনালদি। তার মতে, মার্কিন জ্বালানি উৎপাদকদের আকৃষ্ট করতে ভেনেজুয়েলাকে বাণিজ্যিক, রাজস্ব ও চুক্তিভিত্তিক প্রণোদনা দিতে হবে।
‘সম্পদের দিক থেকে ভেনেজুয়েলার কোনো সীমাবদ্ধতা নেই,’ তিনি বলেন। ‘সমস্যাটা রাজনীতির।’
স্বল্পমেয়াদে বিদ্যমান উপস্থিতির কারণে শেভরনই সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে বলে মনে করেন মনালদি। পাশাপাশি কনোকোফিলিপস ও এক্সনের মতো অন্যান্য মার্কিন কোম্পানিও ভেনেজুয়েলায় আবার ব্যবসা শুরু করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সূত্র: সিবিএস নিউজ
মাহফুজ/