সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সানার (SANA) তথ্যমতে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ হাসান আল-শাইবানি এবং জেনারেল ইন্টেলিজেন্সের মহাপরিচালক হুসেইন আল-সালামার নেতৃত্বে একটি সিরীয় প্রতিনিধিদল ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ইসরায়েলি প্রতিনিধিদের সঙ্গে নতুন দফার আলোচনায় যোগ দিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয় ও মধ্যস্থতায় এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
আজ সোমবার সিরিয়া সরকারের একটি সূত্র সানাকে জানিয়েছে যে, এই আলোচনার পুনঃসূচনা সিরিয়ার সেই অটল অঙ্গীকারকেই নিশ্চিত করে, যার লক্ষ্য হলো কোনো রকম আপস ছাড়াই তাদের জাতীয় অধিকার পুনরুদ্ধার করা।
সিরিয়ার দীর্ঘকালীন নেতা বাশার আল-আসাদের পতনের পর থেকে ইসরায়েল গোলান মালভূমির বাইরেও সিরিয়ার ভূখণ্ডে তাদের দখলদারত্ব সম্প্রসারিত করেছে এবং দক্ষিণ সিরিয়ায় অসংখ্য অভিযান ও বোমাবর্ষণ চালিয়েছে।
গত কয়েক মাস ধরে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ সিরিয়ায়, বিশেষ করে কুনেইত্রা প্রদেশে প্রায় প্রতিদিনই অনুপ্রবেশ করছে। সেখানে তারা ধরপাকড় চালাচ্ছে, চেকপোস্ট বসিয়ে দিচ্ছে এবং জমি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে; যা জনগণের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
সূত্রটি আরও যোগ করেছে, এই আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো ১৯৭৪ সালের ‘সেনা প্রত্যাহার চুক্তি’ (Disengagement Agreement) পুনরায় কার্যকর করা। একটি ন্যায়সংগত নিরাপত্তা চুক্তির কাঠামোর আওতায় ইসরায়েলি বাহিনীকে ৮ ডিসেম্বর, ২০১৪-এর আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য।
এই চুক্তিতে সিরিয়ার পূর্ণ সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বন্ধের নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে।
সরাসরি সামরিক হুমকি কিছুটা কমলেও ইসরায়েলি বাহিনী এখনো বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে, যাতে বেসামরিক মানুষ হতাহত হচ্ছে এবং সিরীয় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনা ও সুযোগ-সুবিধা ধ্বংস হচ্ছে।
‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্ট’ (ACLED)-এর হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে ইসরায়েল সিরিয়াজুড়ে ৬০০-এর বেশি বিমান, ড্রোন এবং কামান হামলা চালিয়েছে, যার গড় হার দিনে প্রায় দুটি।
সেনা প্রত্যাহার চুক্তি
প্রেসিডেন্ট আল-আসাদের পতনের পর ইসরায়েল ১৯৭৪ সালের সেনা প্রত্যাহার চুক্তিটিকে বাতিল ঘোষণা করে। ১৯৭৩ সালের যুদ্ধের পর এই চুক্তিটি সম্পাদিত হয়েছিল, যখন সিরিয়া অধিকৃত গোলান মালভূমি পুনরুদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়।
এই চুক্তির মাধ্যমে জাতিসংঘ নিয়ন্ত্রিত একটি ‘বাফার জোন’ বা নিরপেক্ষ এলাকা তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু ইসরায়েল বর্তমানে সেই চুক্তি লঙ্ঘন করে সিরিয়ার ভূখণ্ডের অনেক গভীরে অগ্রসর হয়েছে।
আল-আসাদের পলায়নের অজুহাত দেখিয়ে ইসরায়েল বলছে যে, এই চুক্তি এখন আর কার্যকর নয়। একইসঙ্গে তারা বিমান হামলা, স্থলপথে অনুপ্রবেশ এবং নজরদারি ফ্লাইট পরিচালনা করছে; চেকপোস্ট বসাচ্ছে এবং সিরীয় নাগরিকদের গ্রেপ্তার বা গুম করছে। তবে সিরিয়া এসব হামলার কোনো পাল্টা জবাব দেয়নি।
ডিসেম্বরের শেষের দিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন যে, ইসরায়েল সিরিয়ার সঙ্গে একটি শান্তিপূর্ণ সীমান্ত নিশ্চিত করতে আগ্রহী।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বাস প্রকাশ করেছেন যে, ইসরায়েল সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারবে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের শেষের দিকে একটি ঝটিকা অভিযানের মাধ্যমে আল-শারা আসাদ সরকারকে উৎখাত করেছিলেন।
ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে একটি নিরাপত্তা চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে গত কয়েক মাস ধরে দফায় দফায় আলোচনা চলছে, যদিও এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি বা অগ্রগতির ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
সিরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় না, এমনকি ট্রাম্পের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এ যোগ দিতেও তাদের কোনো আগ্রহ নেই, যার মাধ্যমে হাতেগোনা কয়েকটি আরব দেশ ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি ওয়াশিংটন স্বীকৃতি দিলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশাল অংশ তা প্রত্যাখ্যান করেছে। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/