মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের দাবির প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় দেশগুলোর সামরিক উপস্থিতি বাড়তে শুরু করেছে। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত এই আর্কটিক দ্বীপে ইতিমধ্যে ইউরোপের একাধিক দেশের সেনা ও সামরিক কর্মকর্তারা পৌঁছেছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুউকে বুধবার (১৪ জানুয়ারি) প্রথম ধাপে ১৫ সদস্যের একটি ফরাসি সামরিক দল পৌঁছায়। এই মোতায়েন একটি তথাকথিত অনুসন্ধানী মিশনের অংশ। ফ্রান্স ছাড়াও জার্মানি, সুইডেন, নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্যের সামরিক কর্মকর্তারা এই যৌথ অভিযানে অংশ নিচ্ছেন।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানিয়েছেন, প্রাথমিক এই দলটিকে শিগগিরই স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথের সামরিক শক্তি দিয়ে আরও জোরদার করা হবে। ফরাসি জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক অলিভিয়ের আরভোর বলেন, এটি শুধু একটি মহড়া নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে একটি স্পষ্ট বার্তা। তার ভাষায়, “এটি প্রথম মহড়া-আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে দেখাতে চাই যে ন্যাটো এখানে উপস্থিত।”
এই সামরিক তৎপরতা এমন এক সময়ে শুরু হলো, যখন ওয়াশিংটনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেন বলেন, আলোচনা গঠনমূলক হলেও দুই পক্ষের মধ্যে ‘মৌলিক মতপার্থক্য’ রয়ে গেছে। পরে তিনি গ্রিনল্যান্ড কেনার বিষয়ে ট্রাম্পের প্রচেষ্টার তীব্র সমালোচনা করেন।
এর বিপরীতে ট্রাম্প নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছেন। ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “জাতীয় নিরাপত্তার জন্য আমাদের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন।”
শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ না করলেও তিনি বলেন, ডেনমার্কের সঙ্গে কোনো না কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব। ট্রাম্প দাবি করেন, রাশিয়া বা চীন যদি গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা করে, তাহলে ডেনমার্ক তা ঠেকাতে পারবে না, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র পারবে এবং ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ঘটনাকে তিনি এর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ইউরোপের নেতারা এই অবস্থানকে বিপজ্জনক বলে আখ্যা দিয়েছেন। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বলেন, পোল্যান্ড এই সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না, তবে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক হস্তক্ষেপ হবে একটি ‘রাজনৈতিক বিপর্যয়’। তার মতে, এক ন্যাটো সদস্যের বিরুদ্ধে অন্য সদস্যের সামরিক পদক্ষেপ নিলে সেটি হবে বর্তমান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবসান।
এদিকে বেলজিয়ামে অবস্থিত রুশ দূতাবাস আর্কটিক পরিস্থিতি নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে। তাদের অভিযোগ, রাশিয়া ও চীনের কথিত হুমকিকে অজুহাত বানিয়ে ন্যাটো গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে।
ডেনমার্ক অবশ্য বলছে, ইউরোপীয় সেনা মোতায়েন কোনো আগ্রাসী পদক্ষেপ নয়। এটি ‘অপারেশন আর্কটিক এনডুরেন্স’ নামে ডেনমার্কের নেতৃত্বাধীন একটি যৌথ ন্যাটো মহড়ার অংশ। এতে মাত্র কয়েক ডজন সেনা অংশ নিচ্ছেন। জার্মানি আজ বৃহস্পতিবার একটি এ৪০০এম পরিবহন বিমানে ১৩ জন সৈন্য নুউকে পাঠাচ্ছে, তবে তারা কেবল শনিবার পর্যন্ত সেখানে থাকবেন।
ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে ইউরোপীয় ও ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক নিরাপত্তা জোরদার করতেই এই পদক্ষেপ। ফরাসি সশস্ত্র বাহিনীর উদ্দেশে দেওয়া নববর্ষের ভাষণে ম্যাক্রোঁ বলেন, গ্রিনল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ এবং একটি ন্যাটো মিত্র হওয়ায় সেখানে ইউরোপের বিশেষ দায়বদ্ধতা রয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডে একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যেখানে প্রায় ১৫০ জন মার্কিন সদস্য কর্মরত। বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী ওয়াশিংটন চাইলে এই সংখ্যা বাড়াতে পারে। তবে ডেনমার্কের নেতৃত্বে ইউরোপীয় এই সামরিক উপস্থিতিকে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি স্পষ্ট বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে—আর্কটিক ও উত্তর আটলান্টিকের নিরাপত্তা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের একক বিষয় নয়।
সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, বুধবার নুউকে সুইডিশ সামরিক কর্মকর্তাদের পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে দুজন নরওয়েজিয়ান সেনা, একজন ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তা এবং একজন ডাচ নৌ কর্মকর্তা সেখানে যাচ্ছেন।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে, তারা ট্রাম্পের নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব দিচ্ছে, তবে রুশ ও চীনা তৎপরতা মোকাবিলায় ন্যাটোর সম্মিলিত প্রস্তুতিই সবচেয়ে কার্যকর পথ। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেন, গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা পুরো ন্যাটো জোটের জন্য একটি যৌথ উদ্বেগ।
ডেনমার্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ট্রোয়েলস লুন্ড পলসেন জানান, পর্যায়ক্রমে বা রোটেশনের ভিত্তিতে সেখানে সেনা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি মিত্রদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একটি স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়।
কোপেনহেগেন ট্রাম্পের যুক্তি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাসমুসেন বলেন, চীন বা রাশিয়ার পক্ষ থেকে এমন কোনো ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’ নেই, যা ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড সামলাতে পারবে না।
এই প্রেক্ষাপটে শুক্রবার ডেনমার্ক সফরে যাচ্ছে ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত একটি মার্কিন প্রতিনিধি দল। সফরের আগে জেডি ভ্যান্স ও মার্কো রুবিওর সঙ্গে আলোচনার পর রাসমুসেন ফক্স নিউজকে বলেন, “প্রেসিডেন্টের উচ্চাকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট, কিন্তু আমাদের নির্দিষ্ট সীমা আছে। এটি ২০২৬ সাল, মানুষের সঙ্গে বাণিজ্য করা যায়, কিন্তু মানুষকে নিয়ে নয়।”
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন বলেছেন, তার অঞ্চল বর্তমানে একটি গভীর ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন হতে চায় না, যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা শাসিত হতে চায় না, যুক্তরাষ্ট্রের অংশও হতে চায় না।” তার ভাষায়, যদি জনগণকে বেছে নিতে বলা হয়, তারা যুক্তরাষ্ট্রের বদলে ডেনমার্ককেই বেছে নেবে। সূত্র: বিবিসি
মাহফুজ/