ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইন যাকে ‘মাদার অব অল ডিলস’ বা ‘সব বাণিজ্য চুক্তির জননী’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, সেই ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) অবশেষে স্বাক্ষরিত হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) বিকেলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা এই সংক্রান্ত একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স -এ মোদী জানান, বিশ্বের দুটি বৃহত্তম গণতান্ত্রিক বাণিজ্য ব্লক, যাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ২১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, তারা ইতিহাসের বৃহত্তম এফটিএ (মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি) সম্পন্ন করেছে। তিনি বলেন, ‘‘আমরা এমন অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছি যা সাধারণ মানুষকে সাহায্য করবে... ভারত-ইইউ বাণিজ্য চুক্তি পারস্পরিক প্রবৃদ্ধির একটি ব্লুপ্রিন্ট।’’
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে বসবাসরত প্রায় আট লাখ ভারতীয় এই চুক্তির ফলে ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন।
নরেন্দ্র মোদী বলেন, ‘‘আজ ২৭ জানুয়ারি, আর এটি একটি সুখকর ও কাকতালীয় ঘটনা যে এই দিনেই ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশের সঙ্গে এই চুক্তি স্বাক্ষর করছে। এটি কেবল একটি বাণিজ্য চুক্তি নয়, এটি অভিন্ন সমৃদ্ধির এক নতুন পথচিত্র।’’
কেন এই চুক্তি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী উল্লেখ করেছেন যে, এই এফটিএ বিশ্ব জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশ। এটি ভারতের টেক্সটাইল, মূল্যবান রত্ন, অলঙ্কার এবং চামড়াজাত পণ্যের মতো অভ্যন্তরীণ খাতগুলোর জন্য ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে।
এই চুক্তির আলোচনা প্রায় দুই দশক ধরে ঝুলে ছিল। ২০০৭ সালে প্রথম আলোচনা শুরু হলেও কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যের বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে মতবিরোধের কারণে ২০১৬ সালে তা থমকে যায়। ২০২২ সালে কোভিড-পরবর্তী বৈশ্বিক পণ্য সরবরাহে সংকট এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আলোচনা পুনরায় শুরু হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতির প্রভাব এবং চীন-নির্ভরতা কমানোর তাগিদ এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
ইইউ নেতাদের প্রতিক্রিয়া
ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা বলেন, ‘‘ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন কৌশলগত এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘ভারত বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতি এবং আজকের এই চুক্তি ইউরোপের জন্য ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। এই চুক্তির ফলে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের একটি বিশাল বাজার তৈরি হবে।’’
কস্তা সবুজ শক্তি বা গ্রিন এনার্জির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি মোদীর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘‘আমরা শান্তি ও আলোচনার পরিবেশ তৈরির জন্য আপনার ওপর আস্থা রাখতে পারি। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের মতো বৈশ্বিক ইস্যুতে আমাদের একসঙ্গে নেতৃত্ব দিতে হবে।’’
উল্লেখ্য, আন্তোনিও কস্তা একজন ওভারসিজ সিটিজেন অব ইন্ডিয়া (OCI) কার্ডধারী এবং তিনি নিজের ভারতীয় বংশোদ্ভূত পরিচয় নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেন।
ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইন বলেন, আমরা করে দেখিয়েছি... আমরা ‘সব চুক্তির জননী’ উপহার দিয়েছি। এটি দুই দানবীয় শক্তির গল্প। ভারত যখন সফল হয়, তখন বিশ্ব আরও নিরাপদ হয়।’’
চুক্তির ফলে ভারতে যা যা সস্তা হবে
এই চুক্তির ফলে ভারতে আমদানিকৃত অনেক ইউরোপীয় পণ্য সস্তা হবে। অন্যদিকে, ইউরোপের বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশাধিকার সহজ হবে।
বিলাসবহুল গাড়ি যেমন মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ এবং অডির মতো গাড়ির ওপর বর্তমানে ১০০ শতাংশের বেশি আমদানি শুল্ক রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, ১৫ হাজার ইউরোর (প্রায় ১৬ লাখ রুপির) বেশি দামের গাড়ির শুল্ক কমিয়ে প্রথমে ৪০ শতাংশ এবং পরে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। ফলে এসব গাড়ির দাম কয়েক লাখ টাকা কমবে। তবে ভারতের ছোট গাড়ির বাজার রক্ষায় ২৫ লাখ রুপির নিচের গাড়িগুলো ইউরোপ থেকে আমদানি করা হবে না।
ফ্রান্স, ইতালি এবং স্পেন থেকে আসা মদের ওপর বর্তমানে ১৫০ শতাংশ শুল্ক রয়েছে, যা কমিয়ে ২০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি আগামী ৫-১০ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে কার্যকর হবে। তবে সস্তা মানের মদ (২.৫ ইউরোর নিচে) এই সুবিধার আওতায় আসবে না।
ক্যানসারসহ অন্যান্য জটিল রোগের জীবনদায়ী ওষুধের দাম কমবে। পাশাপাশি ইউরোপের উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সস্তায় পাওয়া যাবে। ভারতীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোও ইউরোপের ২৭টি দেশের বাজারে বড় সুযোগ পাবে।
বিমানে ব্যবহৃত খুচরা যন্ত্রাংশ, মোবাইল ফোন এবং উচ্চ-প্রযুক্তির ইলেকট্রনিক পণ্যের ওপর শুল্ক তুলে নেওয়া হবে। এর ফলে ভারতে গ্যাজেট তৈরির খরচ কমবে এবং গ্রাহকরা কম দামে ফোন কিনতে পারবেন।
লোহা, ইস্পাত এবং রাসায়নিক পণ্যের ওপর ‘জিরো ট্যারিফ’ বা শূন্য শুল্কের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে নির্মাণ শিল্পে কাঁচামালের দাম কমবে, যা পরোক্ষভাবে আবাসন খাতের জন্য ইতিবাচক।
এই চুক্তির ফলে আগামী পাঁচ বছরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং প্রতিরক্ষা এবং কৌশলগত ক্ষেত্রেও ভারত-ইইউ সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। সূত্র: এনডিটিভি
মাহফুজ/