কৌশলগত দিক থেকে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। আজ মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৬তম ভারত-ইইউ সম্মেলনে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি দুই পক্ষ একটি ঐতিহাসিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর এবং ইউরোপীয় কমিশনের ভাইস-প্রেসিডেন্ট কাজা কালাস এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
এই বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে ভারত এখন জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার পর এশিয়ার তৃতীয় দেশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এই পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা কাঠামোতে যুক্ত হলো।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা এই চুক্তিকে ভারত ও ইইউ-এর মধ্যে প্রথম ব্যাপক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ২০০৪ সাল থেকে দুই পক্ষের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক থাকলেও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে এতদিন কোনো আনুষ্ঠানিক বা বাধ্যতামূলক চুক্তি ছিল না। বর্তমানের অস্থির ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই অংশীদারত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কাঠামোর আওতায় দুই পক্ষ সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সাইবার প্রতিরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মহাকাশ নিরাপত্তার মতো আধুনিক ও সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোতে একে অপরকে সহযোগিতা করবে। এছাড়া সন্ত্রাসবাদ দমন এবং জলদস্যুতা রোধে দুই পক্ষ এখন থেকে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করবে।
একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গুরগাঁওতে অবস্থিত ভারতীয় নৌবাহিনীর ইনফরমেশন ফিউশন সেন্টারে একজন লিয়াজোঁ অফিসার নিয়োগের ইইউ প্রস্তাব ভারত গ্রহণ করেছে।
ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং জানিয়েছেন যে ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা শিল্প ইউরোপের নতুন ‘রি-আর্ম’ (ReArm) উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউরোপ তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে ৮০০ বিলিয়ন ইউরোর যে বিশাল পরিকল্পনা নিয়েছে, সেখানে ভারত একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হতে পারে। রাজনাথ সিংয়ের মতে, এই চুক্তি ভারতের ‘আত্মনির্ভর ভারত’ ভিশনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি বিশ্বস্ত প্রতিরক্ষা ইকোসিস্টেম গড়ে তুলবে।
ভারত ও ইউরোপের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বর্তমানে বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ফ্রান্সের রাফাল ফাইটার জেট, স্করপিওন-ক্লাস সাবমেরিন এবং এয়ারবাস C-295 সামরিক পরিবহন বিমানের মতো বড় প্রকল্পগুলোতে দুই পক্ষ আগে থেকেই কাজ করছে।
পাশাপাশি ভারতের বেসরকারি প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলো বর্তমানে ইউরোপে গোলাবারুদ, ইলেকট্রনিক্স এবং ড্রোন সরবরাহ করছে। এই নতুন অংশীদারত্বের সঠিক বাস্তবায়নের জন্য প্রতি বছর একটি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইন এবং আন্তোনিও কস্তা এই চুক্তিকে বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন।
উল্লেখ্য, গত অক্টোবরে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ভারত সফরের সময় প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ইউরো সমমূল্যের একটি অস্ত্র চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্যে ছিল ভারতীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহারের ইঞ্জিন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় মিসাইল ও লঞ্চার। সূত্র: দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, রয়টার্স
মাহফুজ/