২০২৪ সালের ১০ আগস্ট ভোরে গাজা সিটির আল-তাবিন স্কুলে যখন ইসরায়েলি হামলা হয়, তখন ইয়াসমিন মাহানি তার ছেলে সাদ’কে খুঁজতে ধ্বংসস্তূপের ভেতর হন্যে হয়ে ঘুরছিলেন। তিনি রক্ত আর মাংসের ওপর পা ফেলে চারদিকে খুঁজেছেন, কিন্তু সাদের কোনো চিহ্ন পাননি। ইয়াসমিন একা নন, গাজায় এমন হাজারো ফিলিস্তিনি রয়েছেন যাদের প্রিয়জনরা যুদ্ধের ভয়াবহতায় নিছক নিখোঁজ হননি, বরং আক্ষরিক অর্থেই ‘বাষ্পীভূত’ হয়ে গেছেন।
অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে শরীর: ফরেনসিক রিপোর্ট
আল জাজিরার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘দ্য রেস্ট অব দ্য স্টোরি’-তে গাজা সিভিল ডিফেন্সের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২,৮৪২ জন ফিলিস্তিনি ‘বাষ্পীভূত’ হয়ে গেছেন। তাদের মরদেহের কোনো অবশিষ্টাংশ নেই; কেবল দেওয়ালে লেগে থাকা রক্তের ছিটে অথবা ক্ষুদ্র মাংসপিণ্ড ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরায়েল নিয়মকানুন উপেক্ষা করে এমন কিছু থার্মোবারিক এবং থার্মাল অস্ত্র (ভ্যাকুয়াম বা অ্যারোসল বোমা) ব্যবহার করছে যা ৩,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা তৈরি করতে সক্ষম।
যেভাবে ‘নাই’ হয়ে গেছে দেহ
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ড. মুনির আল-বুরশ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, মানুষের শরীরের প্রায় ৮০ শতাংশই পানি। যখন কোনো শরীর ৩,০০০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা এবং প্রচণ্ড বায়ুচাপের সংস্পর্শে আসে, তখন শরীরের তরল অংশ মুহূর্তেই ফুটতে শুরু করে এবং টিস্যুগুলো পুড়ে ছাই ও বাষ্পে পরিণত হয়। এটি একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়া যা এড়ানো অসম্ভব।
রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞ ভাসিলি ফাতিগারভ জানান, এই বোমাগুলোতে অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং টাইটানিয়ামের গুঁড়া মেশানো থাকে যাতে আগুনের স্থায়িত্ব ও তাপমাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
ব্যবহৃত মার্কিন বোমার তালিকা
অনুসন্ধানে গাজায় ব্যবহৃত বেশ কিছু মার্কিন নির্মিত বোমার নাম উঠে এসেছে যা এই ধ্বংসযজ্ঞের জন্য দায়ী:
MK-84 (হ্যামার): ৯০০ কেজির এই বোমা ৩,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপ তৈরি করতে পারে।
BLU-109 বাঙ্কার বাস্টার: এটি মাটির নিচে বা বদ্ধ স্থানে বিশাল আগুনের গোলক তৈরি করে সব কিছু পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। গত সেপ্টেম্বরে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ ঘোষিত আল-মাওয়াসিতে এই বোমার আঘাতে ২২ জন মুহূর্তেই বাষ্পীভূত হয়ে যান।
GBU-39: আল-তাবিন স্কুলে ব্যবহৃত এই বোমাটি ভবনের কাঠামো ঠিক রেখে ভেতরে থাকা প্রতিটি জীবন্ত প্রাণীকে উচ্চ তাপমাত্রা এবং বায়ুচাপের ঢেউ দিয়ে পুড়িয়ে মারার জন্য তৈরি।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও আইনি প্রশ্ন
আইন বিশেষজ্ঞ ডায়ানা বাট্টু একে ‘বৈশ্বিক গণহত্যা’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে আসা এই মারণাস্ত্রগুলো যোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী একটি যুদ্ধাপরাধ।
আন্তর্জাতিক আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েল অবরোধ, অনাহার এবং এই ধরনের মারণাস্ত্র ব্যবহার করে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেন আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক তারিক শানদাব।
বুরাইজ শরণার্থী শিবিরে নিজের চার সন্তান হারানো রফিক বদরানের আর্তনাদ এই ট্র্যাজেডির গভীরতা বুঝিয়ে দেয়— “আমি লক্ষ বার খুঁজেছি, কিন্তু আমার সন্তানদের এক টুকরো দেহাংশও পাইনি। তারা কোথায় গেল?” সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/