মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এর অধীনে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর অংশ হিসেবে গাজায় ১ হাজার সৈন্য পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ইন্দোনেশিয়া। জাকার্তা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মোট ৮ হাজার সৈন্য মোতায়েনের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এটি তারই প্রথম ধাপ।
ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডনি প্রামোনো জানিয়েছেন, আগামী এপ্রিলের মধ্যে প্রথম দলটি এবং জুনের মধ্যে মূল বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য গাজায় পৌঁছে যাবে। তবে এই দ্রুত মোতায়েন নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার ভেতরেই নানা মহলে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের মধ্যে ইন্দোনেশীয় বাহিনী সেখানে ঠিক কী ভূমিকা পালন করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা।
ইন্দোনেশিয়া জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে অত্যন্ত অভিজ্ঞ একটি দেশ হলেও, সমালোচকদের ভয় যে জাতিসংঘের সরাসরি তত্ত্বাবধান ছাড়া এই অভিযানে ইন্দোনেশীয় সেনারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতের পুতুলে পরিণত হতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব ইন্দোনেশিয়ার সহযোগী অধ্যাপক শোফওয়ান আল বান্না বলেন, আশঙ্কা করা হচ্ছে ইন্দোনেশিয়াকে কেবল ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণ করার একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হবে। ফিলিস্তিনে ইন্দোনেশিয়ার দীর্ঘদিনের সুনাম রয়েছে, কিন্তু তাদের সেনাবাহিনী যদি সেখানে ইসরায়েলি দখলদারত্বকে বৈধতা দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে তা ফিলিস্তিনি ও ইন্দোনেশীয়—উভয় পক্ষের জন্যই অত্যন্ত বেদনাদায়ক হবে।
কূটনৈতিক জটিলতা ও ইসরায়েল প্রসঙ্গ
ইসরায়েলের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। শোফওয়ান আল বান্না মনে করেন, ইন্দোনেশিয়াকে স্পষ্ট করতে হবে যে তাদের সেনারা এমন কোনো স্থানে থাকবে না যেখানে ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি থাকে। পাশাপাশি ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোও এড়িয়ে চলতে হবে, কারণ সেখানে কাজ করতে গেলে ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন হবে, যা প্রকারান্তরে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার শামিল।
উল্লেখ্য, বোর্ড অব পিস-এর সদস্য হিসেবে ইন্দোনেশিয়াই প্রথম দেশ যারা নির্দিষ্ট সংখ্যক সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। এরপর কসোভো, মরক্কো, আলবেনিয়া এবং কাজাখস্তানও সেনা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা সঠিক সংখ্যা এখনো জানায়নি।
বোর্ড অব পিসের গঠন ও ঔপনিবেশিক মানসিকতার অভিযোগ
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই ‘বোর্ড অব পিস’ এবং গাজা নিয়ে তাদের পরিকল্পনা অনেকটা ঔপনিবেশিক ধাঁচের। এই বোর্ডে ফিলিস্তিনিদের অধিকার বা কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব না দিয়ে তাদের কেবল নিয়ন্ত্রণের বস্তু হিসেবে দেখা হচ্ছে। বোর্ডের নির্বাহী কমিটিতে রয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, তার জামাতা জ্যারেড কুশনার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের মতো ব্যক্তিরা।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিদের অংশগ্রহণ রাখা হয়েছে কেবল একটি গুরুত্বহীন ‘ট্রানজিশনাল কমিটিতে’। এই কাঠামোর মধ্যে থেকে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা কতটুকু অর্জিত হবে, তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে।
প্রাবোও সুবিয়ান্তোর বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক কৌশল
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো অবশ্য দাবি করেছেন যে, যদি এই বোর্ড ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে তিনি এখান থেকে সরে আসবেন।
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জোর দিয়ে বলেছে যে, তাদের সেনারা কেবল ফিলিস্তিনের পুনর্গঠন এবং স্বাধীনতার লড়াইয়ে সহায়তা করতেই সেখানে যাচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, প্রাবোও’র এই সিদ্ধান্তের পেছনে ফিলিস্তিন প্রেমের চেয়ে নিজেকে একজন বিশ্বনেতা হিসেবে প্রমাণের আকাঙ্ক্ষা বেশি কাজ করছে। বিশেষ করে ট্রাম্পের সুনজরে থাকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য শুল্ক কমানোর একটি কৌশল হিসেবেও এটিকে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, গাজায় সেনা পাঠিয়ে ইন্দোনেশিয়া ফিলিস্তিনের বন্ধু হিসেবে থাকবে নাকি দখলদারত্বের সহযোগী হয়ে উঠবে, সেটিই এখন বড় দেখার বিষয়। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/