যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী দখল করে জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে আন্তর্জাতিক কোয়ালিশন গঠনের ডাক দিয়েছেন। জাহাজ চলাচল সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর কাছে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এতে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জাহাজ ছাড়া বাকি সব জাহাজের জন্যই হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রয়েছে। লন্ডনভিত্তিক প্যান আরব সংবাদমাধ্যম আল-আরাবি আল-জাদিদকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাগচি বলেন, ইরানের পরিস্থিতি স্থিতিশীল এবং সরকার বা সামরিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কোনো ফাটল নেই।
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন– অনেক দেশ, বিশেষ করে যেসব দেশ ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার প্রচেষ্টার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রণালিটি খোলা ও নিরাপদ রাখতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে।
তিনি আরও লেখেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে ইরানের সামরিক সক্ষমতার শতভাগ ধ্বংস করে দিয়েছি। কিন্তু তারা এখনো সহজেই এক-দুটি ড্রোন পাঠাতে পারে, মাইন পাততে পারে বা এই জলপথের কোথাও কাছ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে দিতে পারে–তারা যতই পরাজিত হোক না কেন।’
ট্রাম্প বলেন, ‘আশা করি চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্যসহ যেসব দেশ এই কৃত্রিম বাধার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তারা এ এলাকায় জাহাজ পাঠাবে, যাতে সম্পূর্ণভাবে নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়া একটি দেশের কারণে হরমুজ প্রণালি আর হুমকির মুখে না থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র উপকূলজুড়ে ব্যাপক বোমা হামলা চালিয়ে যাবে এবং ইরানের নৌকা ও জাহাজগুলোকে পানিতে ডুবিয়ে দেবে। একভাবে না একভাবে আমরা শিগগিরই হরমুজ প্রণালীকে আবার খুলে দেব–নিরাপদ ও মুক্ত করব।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত দুই সপ্তাহে পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরে তেলবাহী ট্যাংকারসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী জাহাজে এক ডজনের বেশি হামলার খবর পাওয়া গেছে।
ইরানি কর্মকর্তারাও প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোকে তারা লক্ষ্যবস্তু করতে পারেন।
এই পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে অধিকাংশ তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। বর্তমানে মূলত ইরান ও চীনের কিছু জাহাজই এই পথ দিয়ে চলাচল করছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কোথাও তেল পাঠাতে না পারায় কিছু আরব তেল রপ্তানিকারক দেশ উৎপাদনও কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে গত দুই সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
ট্যাংকারকে নৌবাহিনীর নিরাপত্তা দেওয়ার পরিকল্পনা
ইরানের সম্ভাব্য হুমকির মুখে হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে সামরিক নিরাপত্তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্রয়োজনে মার্কিন নৌবাহিনী ও মিত্র দেশগুলো যৌথভাবে এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। তবে প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ ধরনের নৌ-অভিযান শুরু করতে এখনো কিছু সময় লাগতে পারে।
মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস্টোফার রাইট বলেন, পরিকল্পনাটি তুলনামূলক দ্রুত বাস্তবায়ন হতে পারে, তবে এখনই তা শুরু করা সম্ভব নয়। তিনি ইঙ্গিত দেন, মাসের শেষ দিকে এই উদ্যোগ শুরু হতে পারে। অন্যদিকে ট্রেজারি সচিব স্কট বেসেন্ট বলেন, সামরিকভাবে সম্ভব হলেই ট্যাংকার এসকর্ট শুরু করা হবে।
সামরিক প্রস্তুতি ও ঝুঁকি
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকারকে নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যাওয়া সহজ কাজ নয়। ইরানের কাছে জাহাজে হামলার জন্য মাইন, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিস্ফোরকবোঝাই দ্রুতগামী নৌকা রয়েছে।
সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সামরিক বিশ্লেষক অ্যারন ম্যাকলিন বলেন, এ ধরনের অভিযান সাধারণত দুই ধাপে পরিচালিত হয়। প্রথম ধাপে শত্রুপক্ষের জাহাজবিধ্বংসী সক্ষমতা কমিয়ে দিতে হয়। এরপর শুরু হয় প্রকৃত এসকর্ট (পাহারা) মিশন।
তার মতে, গত দুই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড ইরানের প্রায় ছয় হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা, ড্রোন তৈরির কারখানা এবং মাইন পাতা জাহাজ। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের সমুদ্রপথে আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা দুর্বল করা।
ম্যাকলিন বলেন, ‘আজই এসকর্ট শুরু করা সম্ভব, কিন্তু যত আগে শুরু করা হবে, ঝুঁকিও তত বেশি থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-জাহাজ যদি এখনই ইরানের উপকূলের কাছাকাছি যায়, তাহলে পরিস্থিতি খুব দ্রুত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।’
ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান সেথ জোনসও মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত আগে ইরানের মাইন পাতা ও জাহাজে হামলার সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
তার মতে, বিমান হামলার মাধ্যমে এই হুমকি যথেষ্ট কমিয়ে আনার আগে মার্কিন নৌবাহিনী প্রণালিতে প্রবেশ করতে চাইবে না।
কনভয় পদ্ধতিতে জাহাজ চলাচল
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এসকর্ট মিশন শুরু হলে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে কনভয় পদ্ধতিতে প্রণালি পার করানো হবে। অর্থাৎ একসঙ্গে কয়েকটি জাহাজকে একটি যুদ্ধজাহাজের তত্ত্বাবধানে নিয়ে যাওয়া হবে।
ম্যাকলিন বলেন, নৌবাহিনী প্রণালির দুই প্রান্তে সমাবেশ এলাকা তৈরি করতে পারে, যেখানে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো জড়ো হবে। এরপর একটি যুদ্ধজাহাজ একসঙ্গে কয়েকটি জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে প্রণালি পার করাবে। পুরো অভিযানে যুদ্ধবিমান, নজরদারি ব্যবস্থা এবং মাইন অপসারণ প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হতে পারে।
আন্তর্জাতিক জোট গঠনের চেষ্টা
এই উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে নয়, বরং আন্তর্জাতিক জোট গঠন করতে চায়। ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশ এ বিষয়ে বিবেচনা শুরু করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়েছে, ট্রাম্পের আহ্বানের পর তারা বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে সম্ভাব্য পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। দেশটির কর্মকর্তারা বলেছেন, জ্বালানি পরিবহনপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন বিকল্প খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যও হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে সহযোগিতার উপায় খুঁজছে। দেশটির জ্বালানি সচিব এড মিলিব্যান্ড বলেছেন, ব্রিটেন যুদ্ধজাহাজ কিংবা মাইন শনাক্তকারী ড্রোন পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ এই প্রণালি দিয়ে হওয়ায় এর অচলাবস্থা আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দ্রুত এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথটি আবার সচল করার উপায় খুঁজছে। সূত্র: মিডল ইস্ট আই, দ্য গার্ডিয়ান