গাজা উপত্যকায় কথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ সাত মাসে গড়ালেও গত দুই দিনে পৃথক ইসরায়েলি হামলায় কয়েকজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সময়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরেও অভিযান ও হামলা অব্যাহত রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ায় একটি ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় আবদেলমালেক ও আবদেল সত্তার আল-আত্তার নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, এলাকাটি যুদ্ধবিরতির আওতায় ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসসাল এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
সেদিনই গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলের জেইতুন এলাকায় ৯ বছর বয়সী সালেহ বাদাউই ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়। এ ছাড়া খান ইউনিসের দক্ষিণে ৩৮ বছর বয়সী মোহসেন আল-দাব্বারি নিহত হন।
মাঘাজি শরণার্থী শিবিরের পূর্বদিকে বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থল ঘরবাড়ি ও তাঁবুর দিকে গুলি চালালে এক কিশোরসহ তিনজন আহত হন বলে একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান। গতকাল শুক্রবার আরও তিন ফিলিস্তিনি নিহত হন। গাজা সিটির পূর্বের শুজাইয়া এলাকায় পানি বহনের সময় গাড়িতে থাকা অবস্থায় ভাই মোহাম্মদ ও ঈদ আবু ওয়ার্দাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাদের আরেক ভাই মাঝারি আহত হন।
একই এলাকায় একটি পানিশোধন স্থাপনাতেও ড্রোন হামলা চালানো হয়, এতে একজন নিহত এবং কয়েকজন আহত হন। গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েল প্রায় ২ হাজার ৪০০টি লঙ্ঘন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে হত্যা, গ্রেপ্তার, অবরোধ এবং খাদ্যসংকট সৃষ্টি।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজার ৩৪০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৭৬৫ জন নিহত হয়েছেন যুদ্ধবিরতির সময়েই। শুধু এপ্রিল মাসের শুরু থেকেই অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৮ এপ্রিল গাজা সিটির পশ্চিমে ড্রোন হামলায় আল-জাজিরার সাংবাদিক মোহাম্মদ উইশাহ নিহত হন।
গতকাল জাতিসংঘের সংস্থা ইউএন উইমেন জানায়, গাজা যুদ্ধে প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৪৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নিহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৮ হাজারের বেশি নারী ও মেয়ে নিহত হয়েছেন।
সংস্থাটির মানবিক কার্যক্রম বিভাগের প্রধান সোফিয়া ক্যালটর্প বলেন, ‘গাজায় আগের সংঘাতগুলোর তুলনায় নারী ও কন্যাশিশুর মৃত্যুর হার অনেক বেশি।’ তিনি যুদ্ধবিরতির পরও সহিংসতা চলতে থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
এদিকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে গতকাল ভোরে একাধিক এলাকায় অভিযান চালানো হয়। দক্ষিণ পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনি বাড়িতে হামলা চালিয়ে দুটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে স্থানীয় এক কর্মী জানিয়েছেন।
ওসামা মাখমারা জানান, অবৈধ ওতনিয়েল বসতি থেকে সশস্ত্র ইসরায়েলিরা ইয়াত্তার পশ্চিমের মাজদ আল-বাআ এলাকায় ঢুকে ফিলিস্তিনিদের বাড়িতে হামলা চালায় এবং খালেদ ও ইয়াসের আবু আলি নামে দুই ভাইয়ের গাড়িতে আগুন দেয়। এ ছাড়া ইসরায়েলি বাহিনী জেরুজালেমের উত্তরের আর-রাম শহরে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। নাবলুসেও বাড়িঘর তছনছ করে প্রায় এক ডজন মানুষকে আটক করা হয়।
ইসরায়েলি সামরিক আইনের অধীনে এসব অভিযান পরিচালিত হয়, যেখানে কোনো তল্লাশি পরোয়ানার প্রয়োজন হয় না। এতে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে সেনাবাহিনীর, অথচ আইন প্রয়োগে তাদের কোনো মতামত থাকে না।
মানবাধিকার সংগঠন অ্যাডামির জানিয়েছে, বর্তমানে ইসরায়েলের কারাগার ও আটক কেন্দ্রে ৯ হাজার ৬০০ ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে ৩৪২ জন শিশু ও ৮৪ জন নারী।
এদের মধ্যে ৩ হাজার ৫৩২ জনকে কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই প্রশাসনিক আটকাদেশে রাখা হয়েছে, যা তিন থেকে ছয় মাস অন্তর নবায়ন করা যায়। এসব মামলার প্রমাণ গোপন রাখা হয়, এমনকি বন্দির আইনজীবীর কাছেও তা দেখানো হয় না। সূত্র: আল-জাজিরা