পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণে ভোর থেকেই বিভিন্ন স্থানে ইভিএম ‘ত্রুটি’ ও সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। এটি রাজ্যের নির্বাচনের দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত পর্ব। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে ভোটার তালিকার বিতর্কিত বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) প্রেক্ষাপটে এই ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) ভোরে ভোটগ্রহণ শুরুর পর ছাপড়া, শান্তিপুর ও ভাঙড়সহ একাধিক স্থানে সহিংসতা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানায়, এন্টালি আসনের বিজেপি প্রার্থী প্রিয়াঙ্কা তিবরেওয়ালের প্রতিনিধিকে একটি ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার পর তিনি ভোটকর্মী ও নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন।
জানা গেছে, বুথটি ছোট হওয়ায় অ্যাজেন্টকে বাইরে যেতে বলা হয়। ওই আসনের তৃণমূল প্রার্থীর এক প্রতিনিধিও এই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। পরে দুজনকেই চলে যেতে বলা হয়। এ সময় প্রিয়াঙ্কা তিবরেওয়াল বলেন, ‘দেখুন ওরা কতটা ক্ষেপে গেছে। শুধু একটা বোতাম চাপানোর জন্য ওরা ভেতরে ১০ জন লোক রেখেছে...’
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নদিয়া জেলার ছাপড়ার ৫৩ নম্বর ভোটকেন্দ্রে তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের হাতে আরেকজন বিজেপি অ্যাজেন্ট মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ওই অ্যাজেন্ট মোশারফ মীরকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
মোশারফ মীর দাবি করেন, এক ডজনেরও বেশি তৃণমূল কর্মী, যাদের একজনের কাছে বন্দুক ছিল- তার ওপর হামলা চালায় এবং রড দিয়ে আঘাত করে।
ছাপড়া আসনের বিজেপি প্রার্থী সৈকত সরকার এই হামলার জন্য তৃণমূল কর্মীদের দায়ী করে বলেন, হামলায় তার মাথায় আঘাত লেগেছে। এ ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। তবে তৃণমূল হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এদিকে, হাওড়াতেও ইভিএম বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বিকলের খবর পাওয়া গেছে।
পিটিআই-এর শেয়ার করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য ও একজন পুলিশ একজন ব্যক্তিকে হাত-পা ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ভিডিওতে আরও দেখা যায়, দুজন সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মী লাঠি দিয়ে আরেক ব্যক্তিকে আঘাত করছেন।
বিজেপি ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ইভিএম দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়। বিরোধী দলগুলো নিয়মিত অভিযোগ করে আসছে যে, বিজেপি তাদের প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করতে ইভিএমে কারচুপি করে। তবে নির্বাচন কমিশন বারবার ইভিএমের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
শান্তিপুর থেকেও সম্পত্তি ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। পুলিশ জানায়, স্থানীয় একটি বিজেপি শিবিরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়েছে, যা এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ে অভিযোগ উঠেছে, বামফ্রন্ট-সমর্থিত ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের এক পোলিং অ্যাজেন্টকে ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘বিজেপির নির্দেশে কাজ করার’ অভিযোগ তুলেছেন।
তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় বাহিনী আমাদের লোকজনকে বেছে বেছে হেনস্থা করছে... এভাবে ভোটগ্রহণ করা যায় না।’
বাইরে থেকে ‘পর্যবেক্ষক’ আনার জন্য বিজেপির সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, ‘বাইরে থেকে এত পর্যবেক্ষক এসেছেন এবং বিজেপি যা বলছে তাই করা হচ্ছে। আমাদের পোস্টার সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এভাবে কি নির্বাচন হয়? ভোট দেবেন ভোটাররা, নিরাপত্তা বাহিনী নয়। কিছু নতুন লোক আনা হয়েছে... তারা সন্ত্রাস চালাচ্ছে।’
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও ভবানীপুরে ভোট দেওয়ার পর একই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, বাইরের পর্যবেক্ষকরা ‘জনগণের রায় লঙ্ঘন’ করছেন।
ভবানীপুর তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি, যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১১, ২০১৬ ও ২০২১ সালে জয়ী হয়েছিলেন। ২০২৬ সালের এই নির্বাচনকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার সাবেক সহযোগী থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া শুভেন্দু অধিকারীর মধ্যে হাইপ্রোফাইল লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এটি পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের দ্বিতীয় ও শেষ দফা; প্রথম দফা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৩ এপ্রিল এবং ফলাফল ঘোষণা করা হবে ৪ মে।
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) অংশ হিসেবে মৃত, ভুয়া, অবৈধ এবং রাজ্যের বাইরে চলে যাওয়া ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
এই সংশোধনের ফলে ভোটার তালিকা থেকে ৯০ লাখ ৮০ হাজার ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। তৃণমূলের অভিযোগ, বিরোধী সমর্থকদের ভোটাধিকার কেড়ে নিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
প্রথম দফায় ভোটের হার ছিল রেকর্ড ৯২.৮৮ শতাংশ। এনডিটিভি
অমিয়/