ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নিরঙ্কুশ জয় বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাজ্যে প্রথমবারের মতো বিজেপির এই উত্থান তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি ও সীমান্ত নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোকে আলোচনায় এনেছে। নির্বাচনি প্রচারে বিজেপি নেতাদের ‘পুশ-ইন’ সংক্রান্ত বক্তব্যে বাংলাদেশে উদ্বেগ তৈরি হলেও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বড় ধরনের নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম দেখছেন। তবে সাম্প্রদায়িক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের সরকারকে আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ঢাকা ও দিল্লির শীর্ষ নেতৃত্বের পারস্পরিক সমঝোতাই আগামী দিনের সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণ করবে।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এ রকম মতামত তুলে ধরা হয়েছে।
নির্বাচনি প্রচারকালে বিজেপি নেতাদের দেওয়া বিভিন্ন বিতর্কিত বক্তব্য এবং পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সরকার পরিবর্তনের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি সাধারণত কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত হয় এবং এটি রাতারাতি পরিবর্তিত হয় না। নির্বাচনের সময়কার রাজনৈতিক বক্তব্য অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি কূটনীতিতে প্রভাব ফেলে না। তা সত্ত্বেও, সীমান্তবর্তী একটি রাজ্যে ক্ষমতার পটপরিবর্তন কিছু ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ ও কিছু ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি। দীর্ঘ সময় ধরে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এই চুক্তিতে রাজি থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। কেন্দ্রীয় সরকার বারবারই রাজ্য সরকারের দোহাই দিয়ে এই চুক্তি থেকে পিছিয়ে এসেছে। এখন কেন্দ্র এবং পশ্চিমবঙ্গ–উভয় স্থানেই বিজেপির সরকার থাকায় এই অজুহাতের পথ বন্ধ হলো বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমদ মনে করেন, আগে বিজেপি সরকার তৃণমূল কংগ্রেসের ওপর দায় চাপাত। এখন একই দলের সরকার হওয়ায় তিস্তা চুক্তি নিয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এই অগ্রগতি মূলত দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করবে। অন্যদিকে অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন মনে করেন, তিস্তা চুক্তিতে কেবল রাজ্য সরকার নয়, কেন্দ্রীয় সরকারের স্বার্থও জড়িত। ফলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সদিচ্ছা ছাড়া কেবল রাজ্য সরকারের পরিবর্তনে আমূল পরিবর্তন আসবে না।
সীমান্ত নিরাপত্তা ও ‘পুশ-ইন’ আতঙ্ক বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনি প্রচারে বিজেপি নেতারা মুসলমানদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। এর ফলে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় ইতোমধ্যে সতর্কতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, পুশ-ইন ইস্যু মোবিবেলায় বিজিবিকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদিও তিনি মনে করেন, বাস্তবে এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা কম। বিশ্লেষকদের মতে, ভোটের রাজনীতির বক্তব্য আর প্রশাসনিক বাস্তবতা এক নয়। তবে পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক কোনো উত্তেজনা তৈরি হলে তার প্রভাব ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশেও পড়তে পারে। সম্প্রতি জয়ের পর কলকাতায় একটি অপ্রীতিকর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের কিছুটা টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল। আগরতলায় বাংলাদেশের মিশনে হামলা এবং ভিসা বন্ধ হওয়ার মতো ঘটনাগুলো সেই তিক্ততা আরও বাড়িয়েছিল। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশের নতুন নির্বাচিত বিএনপি সরকার ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ স্পষ্ট করেছেন, পশ্চিমবঙ্গে যে সরকারই থাকুক না কেন, বাংলাদেশ ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি মেনে চলবে। পানি সমস্যা বা সীমান্ত ইস্যুর মতো অমীমাংসিত বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করতে চায় ঢাকা। বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে যদি সঠিক আন্ডারস্ট্যান্ডিং থাকে, তবে প্রাদেশিক ক্ষমতার বদল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কোনো গুণগত বা নেতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত দিল্লি ও ঢাকার কূটনৈতিক সদিচ্ছাই নির্ধারণ করবে– পশ্চিমবঙ্গের এই পালাবদল বন্ধুত্বের পথে বাধা হবে নাকি আশীর্বাদ।