ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তামিলগা ভেট্টি কাঝাগম (টিভিকে) দলের প্রধান অভিনেতা বিজয় থালাপতি। শপথ নেওয়ার পরপরই জনকল্যাণমুখী একাধিক বড় পদক্ষেপ নিলেন তিনি। গতকাল রবিবার শপথ গ্রহণের পর প্রথম যে ফাইলে স্বাক্ষর করেছেন, তাতে রাজ্যে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মাদক নির্মূলে বিশেষ টাস্কফোর্স এবং নারীদের নিরাপত্তায় বিশেষ বাহিনী ও হেল্পলাইন গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
চেন্নাইয়ের নেহরু ইনডোর স্টেডিয়ামে এক আবেগঘন পরিবেশে থালাপতি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে তিনি নিজের সাধারণ জীবন ও সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন।
বিজয় বলেন, ‘একজন সহকারী পরিচালকের ছেলে আজ মুখ্যমন্ত্রী হয়েছি। আমি কোনো রাজপরিবার থেকে আসিনি। অনেক বাধা ও অপমান সহ্য করে আমি আজ এখানে পৌঁছেছি। আপনারা আমাকে আপনাদের ভাই ও সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেছেন।’
রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে বিজয় বলেন, পূর্ববর্তী ডিএমকে সরকারের আমলে ঋণের বোঝা প্রায় ১০ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তবে তিনি জনগণকে আশ্বস্ত করেন, জনগণের একটি টাকাও অপচয় হতে দেবেন না এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন উপহার দেবেন। তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানীয় জল, কৃষক ও মৎস্যজীবীদের কল্যাণে বিশেষ নজর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। নতুন এই সরকারকে তিনি ‘প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের যুগ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীসহ বামপন্থি ও অন্য মিত্র দলগুলোর শীর্ষ নেতারা। বিজয় তার বক্তব্যে রাহুল গান্ধী ও অন্য জোটসঙ্গীদের ধন্যবাদ জানান। উল্লেখ্য, সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে বিজয়ের দল একক বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। দীর্ঘ এক সপ্তাহের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে কংগ্রেস, সিপিআই, সিপিএম, ভিসিকে এবং আইইউএমএলের সমর্থনে ১২০ জন বিধায়কের শক্তি নিয়ে সরকার গঠন করে টিভিকে। এর মাধ্যমে গত ৬০ বছরে এই প্রথম তামিলনাড়ুতে ডিএমকে বা এআইএডিএমকের বাইরে অন্য কোনো দল সরকার গড়ল।
বিজয়ের সঙ্গে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন আরও ৯ জন। তাদের মধ্যে রয়েছেন তার প্রধান কৌশলী আধভ অর্জুনা, সিআরটি নির্মল কুমার, দলের সাধারণ সম্পাদক ‘বুসি’ আনন্দ এবং কেবিনেটের কনিষ্ঠতম সদস্য ২৮ বছর বয়সী এস কীর্তনা। আগামী ১৩ মের মধ্যে বিধানসভায় বিজয় সরকারকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই ফ্লোর টেস্ট বা আস্থা ভোটই হবে নতুন সরকারের পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।
ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু শুধু আমিই
তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন ‘থালপাতি’ সি জোসেফ বিজয়। গতকাল মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর প্রথম বক্তব্যেই তিনি ঘোষণা করেন, রাজ্যে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হবে কেবল একটিই, আর সেটি হলেন তিনি নিজে। বিজয় বলেন, ‘আমার বাইরে দ্বিতীয় কোনো ক্ষমতার কেন্দ্র থাকবে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আমিই হব একমাত্র চালিকাশক্তি।’ তার এই মন্তব্যকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মিত্র জোটের প্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে সরকার পরিচালনার একটি বার্তা হিসেবে দেখছেন।
নাটকীয় রাজনৈতিক মোড় আর টানটান উত্তেজনার পর ক্ষমতা গ্রহণ করে বিজয় নিজেকে জনগণের ‘থাম্বি’ (ছোট ভাই) হিসেবে পরিচয় দেন। তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি নিজে কোনো ভুল করব না এবং আমার সঙ্গে থাকা অন্যদেরও ভুল করতে দেব না। যারা সরকারকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা করছেন, তারা সেই চিন্তা এখনই ডিলিট করে দিন।’
তামিলনাড়ুর মানুষের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, তিনি কোনো স্বর্গীয় দূত নন, বরং সাধারণ মানুষের মতোই একজন মানুষ। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, জনগণের একটি পয়সাও তিনি স্পর্শ করবেন না এবং যেসব প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব, কেবল সেগুলোই তিনি ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করবেন।
সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন দেওয়ায় বিজয় ডিএমকের সাবেক মিত্র দলগুলোকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করে তিনি মল্লিকার্জুন খাড়গে, কে সি ভেনুগোপাল, পি শানমুগাম এবং থল তিরুমাভালাভানের মতো নেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এ ছাড়া তার দলের কর্মী ও সোশ্যাল মিডিয়া যোদ্ধাদেরও ধন্যবাদ জানান তিনি।
উল্লেখ্য, টিভিকে একক বৃহত্তম দল হিসেবে ১১৮ আসনের ‘ম্যাজিক নম্বর’ ছুঁতে না পারলেও কংগ্রেস, বাম দল এবং ভিসিকের সমর্থনে ১২০ জন বিধায়ক নিয়ে সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়েছে। সূত্র: এনডিটিভি