যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বার্থকেন্দ্রিক ও বিশৃঙ্খল শাসনব্যবস্থা এবং রিপাবলিকানদের রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার কৌশলের মধ্যে সংঘাত এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
ক্রমশ কমতে থাকা জনপ্রিয়তা ও জরিপে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত সত্ত্বেও ট্রাম্প বিতর্কিত নীতিগুলো সামনে এগিয়ে নিচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইরান যুদ্ধ, তার কাঙ্ক্ষিত বলরুম প্রকল্প এবং ১ দশমিক ৭৭৬ বিলিয়ন ডলারের তথাকথিত ‘অ্যান্টি-ওয়েপনাইজেশন’ তহবিল। প্রশাসনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, এই তহবিল থেকে এমন ব্যক্তিরাও সুবিধা পেতে পারেন যারা পুলিশের ওপর হামলায় জড়িত ছিলেন।
এই সপ্তাহে ট্রাম্প টেক্সাস সিনেট নির্বাচনে বর্তমান রিপাবলিকান সিনেটরের বদলে কেইন প্যাক্সটনকে সমর্থন দিয়েছেন। যদিও রিপাবলিকানদের একাংশ আশঙ্কা করছে, নানা বিতর্কে জড়ানো প্যাক্সটন নভেম্বরে দলের গুরুত্বপূর্ণ একটি আসন এমনকি সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতাও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারেন।
এতদিন ট্রাম্পের প্রতি নিঃশর্ত অনুগত বলে পরিচিত কংগ্রেসের রিপাবলিকানরাও যেন এবার সীমারেখায় পৌঁছে গেছেন। ‘অ্যান্টি-ওয়েপনাইজেশন’ তহবিলের বিরুদ্ধে এবার তারা প্রকাশ্যেই ক্ষোভ দেখিয়েছেন। কেউ একে বলেছেন ‘চূড়ান্ত বোকামি’, কেউ বলেছেন ‘ব্যাখ্যাতীত’; আবার কেউ একে ‘নৈতিকভাবে ভুল ও সম্পূর্ণ নির্বুদ্ধিতা’ বলে মন্তব্য করেছেন। এ বিরোধিতার জেরে বৃহস্পতিবার সিনেট রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের অভিবাসন আইন পাস না করেই ওয়াশিংটন ত্যাগ করেন।
সিনেট সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা জন থুনে ইঙ্গিত দিয়েছেন, হোয়াইট হাউস ও কংগ্রেসের রিপাবলিকানদের মধ্যে বাস্তব ফাটল তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পও গত বৃহস্পতিবার স্বীকার করেন, সিনেট রিপাবলিকানদের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে। গত শুক্রবার তিনি তহবিল ও সিনেট রিপাবলিকানদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করে দুটি পোস্ট দেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর ছয় মাসেরও কম সময় বাকি। এখন প্রশ্ন উঠছে, রিপাবলিকান পার্টি কোন পথে যাবে?
ওয়াশিংটনে দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, শেষ পর্যন্ত রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের কাছেই নতিস্বীকার করবে। অনেকে মনে করছেন, সিনেট রিপাবলিকানরা হয়তো কঠিন ভোট এড়াতেই আপাতত পরিস্থিতি ঝুলিয়ে রেখেছেন।
সম্ভবত আইনপ্রণেতারা ‘অ্যান্টি-ওয়েপনাইজেশন’ তহবিলের কিছু অংশ সীমিত করার চেষ্টা করতে পারেন। বিশেষ করে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটলে হামলায় পুলিশের ওপর আক্রমণকারীদের ক্ষতিপূরণ না দেওয়ার মতো বিধান যুক্ত হতে পারে, যাতে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়।
কিন্তু হোয়াইট হাউস ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে, এ ধরনের পরিবর্তন তারা মেনে নেবে না। এমনকি তহবিল নিয়ে আপত্তি মিটলেও ট্রাম্পের বলরুম প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে।
সিনেট পার্লামেন্টারিয়ান জানিয়েছেন, বলরুমের নিরাপত্তার জন্য শত শত মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ অভিবাসন বিলের অংশ হতে পারে না। ফলে রিপাবলিকানদের সমর্থন থাকলেও সেই অর্থ কীভাবে অনুমোদিত হবে, তা স্পষ্ট নয়।
রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা সাধারণত ট্রাম্পের প্রতি অনুগত থাকলেও এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ট্রাম্প এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অজনপ্রিয়, আবার একই সঙ্গে আগের চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণহীন। এতে নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের জন্য টানা কয়েক মাসের রাজনৈতিক অস্বস্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এখন ট্রাম্প নিজেই সংখ্যার অঙ্কে সমস্যায় পড়ছেন।
সিনেটে রিপাবলিকানদের ৫৩টি আসন থাকলেও তাকে বরাবরই আলাস্কার লিসা মারকোয়স্কি ও মেইনের সুজান কলিন্সের মতো মধ্যপন্থিদের সামলাতে হয়। কলিন্স আবার একটি ডেমোক্র্যাটপ্রবণ অঙ্গরাজ্যে কঠিন পুনর্নির্বাচনি লড়াইয়ে আছেন। এ ছাড়া উত্তর ক্যারোলিনার থম টিলিস ও কেন্টাকির মিচ ম্যাকনেলের মতো অবসরের পথে থাকা সিনেটররাও এখন ট্রাম্পের সমালোচনায় সরব।
সাম্প্রতিক পদক্ষেপে ট্রাম্প আরও নতুন বিরোধী তৈরি করেছেন বলেও মনে করা হচ্ছে।
লুইজিয়ানার সিনেটর বিল ক্যাসিডিকে প্রাইমারিতে হারানোর পর এখন তিনি পুনর্নির্বাচনের চাপমুক্ত। এক সময় ট্রাম্পের অভিশংসন বিচারে দোষী সাব্যস্ত করার পক্ষে ভোট দেওয়া ক্যাসিডি এখন আরও স্বাধীনভাবে মত দিচ্ছেন।
একই ধরনের পরিস্থিতি টেক্সাসেও তৈরি হতে পারে, যদি জন করনিন ট্রাম্প সমর্থিত প্যাক্সটনের কাছে প্রাইমারিতে হেরে যান। গত শুক্রবার সকালে ট্রাম্প নিজেই তার ‘সংখ্যার সমস্যা’ স্বীকারের মতো মন্তব্য করেন। টিলিসকে উদ্দেশ করে তিনি লেখেন, এখন সে তার কিছু বন্ধুকে নিয়ে কয়েক মাস মজা করতে এবং রিপাবলিকান পার্টির ক্ষতি করতে পারবে।
এর মানে এই নয় যে, রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের সব উদ্যোগ আটকে দেবেন। তবে দলীয় নেতারা যদি রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর উদ্যোগ ঠেকাতে চান, তা হলে এখন এমন অনেক আইনপ্রণেতা আছেন যারা ট্রাম্পের বিপক্ষে ভোট দিতে প্রস্তুত হতে পারেন।
ক্যাসিডি বা করনিন কী ভোট দেবেন, তার চেয়েও বড় বিষয় হলো ট্রাম্প তাদের যেভাবে টার্গেট করেছেন। ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের নিজ দলের বর্তমান সিনেটরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া প্রায় নজিরবিহীন ঘটনা। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, রিপাবলিকানদের নির্বাচনি সাফল্যের চেয়ে নিজের প্রতিশোধ ও ব্যক্তিগত স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন ট্রাম্প।
এই টানাপোড়েন দীর্ঘস্থায়ী হলে আগামী সপ্তাহ ও মাসগুলোতে তা বড় ধরনের আইনগত জটিলতা তৈরি করতে পারে। ট্রাম্প ১ জুনের মধ্যে অভিবাসন প্যাকেজ পাসের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সামনে রয়েছে ১২ জুনের সময়সীমা, যখন বিতর্কিত নজরদারি আইন ফরেন ইন্টেলিজেন্স সার্ভিলিয়েন্স অ্যাক্ট সেকশন ৭০২ পুনরায় অনুমোদনের বিষয়টি কংগ্রেসে উঠবে।
এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগও ঝুলে আছে। এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ নিশ্চিত হয়নি। ট্রাম্প চাইলে টড ব্ল্যানচকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে রেখেও দিতে পারেন। কিন্তু ‘অ্যান্টি-ওয়েপনাইজেশন’ তহবিল নিয়ে ক্ষোভের কারণে রিপাবলিকানদের একাংশ হয়তো তার মতো ট্রাম্পঘনিষ্ঠ প্রার্থীদের সমর্থন নাও করতে পারেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে, সুপ্রিম কোর্টে শূন্যপদ তৈরি হওয়া। এখন পর্যন্ত বিচারপতি স্যামুয়েল আলিটো বা ক্ল্যারেন্স টমাস অবসরের ইঙ্গিত দেননি। তবে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ গ্রীষ্ম তাদের জন্য অবসরের উপযুক্ত সময় হতে পারে।
৫৩ আসনের রিপাবলিকান সিনেট সম্ভবত তাদের বদলি নিয়োগ আটকে দেবে না। তবে সিনেটের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ট্রাম্পের জন্য এমন কোনো চরমপন্থি বিচারপতি মনোনয়ন কঠিন করে তুলতে পারে, যিনি ট্রাম্পের প্রত্যাশামতো কাজ করবেন।
হয়তো রিপাবলিকানরা শেষ পর্যন্ত আপাতত পরিস্থিতি সামলে নিতে পারবেন। কিন্তু ট্রাম্পের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, খুব দ্রুতই তিনি আবারও রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারেন। কারণ দলীয় স্বার্থের চেয়ে নিজের স্বার্থ নিয়েই তিনি বেশি চিন্তিত। আর কোনো আইনপ্রণেতার কাছে নিজের আসন হারানোর ভয় থেকে বড় প্রেরণা আর কিছুই নেই। সূত্র: সিএনএন