যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা সম্ভাব্য একটি চুক্তির দিকে এগোলেও তেহরান ক্রমশ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুদ্ধ পুনরায় শুরু হলে তা আগের সংঘাতের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত ও জটিল হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বৃহস্পতিবার (২৮ মে) জানিয়েছেন, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি অস্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানো হয়েছে, যা এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
তবে কূটনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও সামরিক উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে দ্বিতীয় দফা হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনাও অব্যাহত রয়েছে।
ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, কূটনীতি ব্যর্থ হলে তাদের কাছে শক্তিশালী সামরিক বিকল্প রয়েছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ডস কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, নতুন সংঘাত ‘অঞ্চলের বাইরেও’ ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং শত্রুদের জন্য ‘অপ্রত্যাশিত পরিণতি’ বয়ে আনতে পারে।
এই সতর্কবার্তা এমন এক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এসেছে, যেখানে ইরান মার্কিন ঘাঁটি, ইসরায়েলি শহর এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
গত সপ্তাহে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ভবিষ্যতে যেকোনো প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপে ‘আরও অনেক চমক’ থাকতে পারে।
অন্যদিকে ইরানের সামরিক বাহিনী ‘নতুন সরঞ্জাম’ ব্যবহার এবং ‘নতুন ফ্রন্ট’ খোলার ইঙ্গিত দিয়েছে। দেশটির শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ দাবি করেছেন, যুদ্ধবিরতির সময় সশস্ত্র বাহিনী তাদের সক্ষমতা ‘সর্বোচ্চ পর্যায়ে’ পুনর্গঠন করেছে।
যুদ্ধ পুনরায় শুরু হলে ইরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া
১. নতুন সামুদ্রিক অবরোধ
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রচলিত যুদ্ধে সরাসরি সামরিক বিজয় অর্জন ইরানের জন্য কঠিন। ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথকে লক্ষ্যবস্তু করার কৌশল নিতে পারে তেহরান।
হরমুজ প্রণালীর পর এবার ইয়েমেনভিত্তিক হুথি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে চাপ সৃষ্টি করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই সমুদ্রপথ ইউরোপ, এশিয়া এবং আরব বিশ্বের মধ্যে বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট। ২০২৩ সালে বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ১০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে যেত।
২. উপসাগরীয় তেল স্থাপনায় হামলা
যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল শোধনাগার, জ্বালানি অবকাঠামো বা বিদ্যুৎকেন্দ্রকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়, তাহলে ইরান পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর তেল স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির সদস্য আহমাদ বাখশায়েশ আরদেস্তানি বলেছেন, ‘যদি তারা আমাদের তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, তাহলে আমরা তাদের তেলক্ষেত্র লক্ষ্যবস্তু করতে পারি, যাতে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পায়।’
৩. গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু
যুদ্ধবিরতির পরও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থাপনায় ড্রোন হামলার অভিযোগ উঠেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সংঘাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্দর, বিমানবন্দর এবং পানি শোধনাগারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের ডেসালিনেশন (সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ) প্ল্যান্টগুলো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এগুলো সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
৪. ইউরোপে মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হওয়ার আশঙ্কা
ইরান ইউরোপে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর বিষয়ে পরোক্ষ সতর্কবার্তা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাষ্ট্রীয় ঘনিষ্ঠ কিছু মাধ্যমে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক সম্পদের ছবি প্রকাশ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে ইউরোপে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো- যেমন যুক্তরাজ্যের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ও আরএএফ লেকেনহেথ অথবা জার্মানির রামস্টাইন লজিস্টিক্যাল ও টেলিযোগাযোগ কেন্দ্র তেহরানের হুমকির আওতায় আসতে পারে।
৫. উন্নত ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ
ইরান ইতোমধ্যে ড্রোন প্রযুক্তি ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যৎ সংঘাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সমৃদ্ধ ড্রোনের ঝাঁক, উচ্চগতির ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং স্যাটেলাইট বা যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত করার প্রযুক্তি আরও বেশি ব্যবহৃত হতে পারে।
তেহরানের দাবি, তারা নতুন প্রজন্মের সামরিক প্রযুক্তি পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করেছে এবং ভবিষ্যতে এসব সক্ষমতা আরও সম্প্রসারণ করা হবে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
যদিও কূটনৈতিক আলোচনা এখনো চলমান এবং উভয়পক্ষ একটি স্থায়ী সমঝোতার পথ খুঁজছে, তবুও সামরিক প্রস্তুতি ও কঠোর বক্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান আলোচনা ব্যর্থ হলে সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও এর ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে। সূত্র: সিএনএন
অমিয়/