একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীরা যে সুখী-সমৃদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই পথে কতটা হেঁটেছে বাংলাদেশ? তাদের রেখে যাওয়া বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের সংরক্ষণ-মূল্যায়ন কতটা করেছে এই রাষ্ট্র- এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো খুঁজে ফেরেন শহীদ পরিবারের সন্তানরা। তাদের কারও ভাষ্যে, অবকাঠামোগত বহু উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় এখনো অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। কেউ বলছেন, আমলাতান্ত্রিক মনোবৃত্তিতে দেশ এখন শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ইতিহাস ভুলতে বসেছে।
অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, লেখক-সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সার, চলচ্চিত্র নির্মাতা জহির রায়হান, চিকিৎসক এ এফ এম আবদুল আলীম চৌধুরী বা নড়াইলের অধ্যাপক শেখ আব্দুস সালামের সন্তানদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে নানা আক্ষেপের কথা।
নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে ভুলে যাচ্ছে বুদ্ধিজীবীদের আদর্শ-চেতনা
শহীদ বুদ্ধিজীবীরা স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়তে যে অসাম্প্রদায়িক, শোষণমুক্ত ও মানবিক মূল্যবোধের যে স্বপ্ন বুনেছিলেন, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পরে বাংলাদেশ সেই পথ থেকে সরে এসেছে। এমন মন্তব্য করেছেন শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সন্তানরা।
শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তানদের সংগঠন প্রজন্ম-৭১-এর সভাপতি এবং অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর সন্তান আসিফ মুনীর তন্ময় বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু এবং আমাদের বাবাদের আদর্শ ছিল অসাম্প্রদায়িকতা। সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে আমরা তা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। এটা আমাদের ব্যর্থতা। সমাজে এখনো ধনী-গরিবের পার্থক্য রয়ে গেছে; সমাজতন্ত্র সে অর্থে নেই।’
শহীদ বুদ্ধিজীবী জহির রায়হানের ছেলে অনল রায়হান বলেন, বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন আহমদ, জহির রায়হান কিংবা গেরিলা যোদ্ধা আজাদ-বদি-রুমিরা কখনো উপনিবেশবাদ, অভিজাততন্ত্র বা সামন্তবাদ চাননি। কিন্তু পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পরে বাংলাদেশ সেই ব্রিটিশ আর পাকিস্তানি শাসনামলে ফিরে গেছে। এ দেশে বৈষম্যহীন, সাম্যবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যায়নি।
অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর ছেলে তানভীর হায়দার চৌধুরী বলেন, ‘আমরা শহীদ বুদ্ধিজীবী সন্তানরা আশাহত হই যখন দেখি দেশে ধর্মান্ধতার হার বাড়ছে। সামনেই নির্বাচন। সেই নির্বাচনে যারা প্রার্থী হবেন তারা তো নির্বাচিত হয়ে জনগণের কথা বলবেন। অথচ তাদের নির্বাচিত করছে দল। এগুলো আমাদের ভাবিয়ে তোলে।’
শহীদ বুদ্ধিজীবীদের বহু স্মৃতি বিলুপ্ত
প্রজন্ম-৭১-এর সভাপতি আসিফ মুনীর তন্ময় বলেছেন, একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের লেখনীগুলো বাংলাদেশ সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারেনি। অযত্ন-অবহেলায় বহু লেখা হারিয়ে গেছে। পাশাপাশি ইন্টারনেটে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের বিষয়ে বিভিন্ন রকম তথ্য থাকায় তরুণ পাঠক-গবেষকরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। তিনি বলেন, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের লেখনীতে তাদের আদর্শ ও চিন্তার কথা উঠে এসেছে। তারা একটি সুখী-সমৃদ্ধ ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে ভবিষ্যতের যে স্বপ্ন বুনেছিলেন সেই কথা তার লেখনীতে ছিল। এমন অনেক লেখা হারিয়ে গেছে। ব্যক্তি পর্যায়ে হয়তো কেউ কেউ সংগ্রহ বা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানে দিতে গেলে তারা আর স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন না। কারণ অনেক শহীদ পরিবারের কথা জানি, যারা শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নানা স্মৃতিস্মারক সরকারি প্রতিষ্ঠানে দেওয়ার পরে জানেন না যে সেগুলো আদৌ প্রদর্শিত হয়েছে কি না। এতে তারা মনোক্ষুণ্ন।
শহীদুল্লা কায়সার তনয়া শমী কায়সার বলেন, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ইতিহাস তরুণ প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নির্মাণ করতে হবে প্রামাণ্যচিত্র। সেই প্রামাণ্যচিত্রগুলো বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রদর্শনের বন্দোবস্তও করতে হবে। তিনি জানান, তার নিজস্ব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ধানসিঁড়ি প্রডাকশন থেকে নির্মিত হচ্ছে চলচ্চিত্র ‘দিগন্তে ফুলের আগুন’। এই চলচ্চিত্রে শহীদুল্লা কায়সারকে নতুনভাবে আবিষ্কার করবে তরুণরা।
শহীদ জায়াদের স্বীকৃতি দাবি
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক শেখ আব্দুস সালামের মেয়ে সালমা নার্গিসের দাবি, একাত্তরে স্বামী হারানো শহীদ জায়ারা দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে যে সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সংগ্রাম করে গেছেন তার স্বীকৃতি দিতে হবে রাষ্ট্রকে। তিনি বলেন, ‘আমার মা বেগম মনোয়ারা সালামের মতো অসংখ্য শহীদজায়া রয়েছেন সারা দেশে। আমাদের মায়েরা দীর্ঘদিন ধরে যে সামাজিক অবস্থান আর মানসিক কষ্টের মধ্যে দিয়ে দিনাতিপাত করেছেন, যেভাবে ইতিহাসের ধারাপাত বয়ে নিয়ে গেছেন, তারও একটা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দরকার।’