তখন ছিল গ্রীষ্মকাল। উদয়ী বামনরাঙা নামক এক প্রজাতির পুঁচকে মাছরাঙা পাখির খোঁজে রাঙামাটির কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে গিয়েছিলাম। তপ্ত রোদ। তবে ছায়া থাকায় বনের মধ্যে হাঁটতে খুব একটা সুবিধা হচ্ছে না। বেশির ভাগ সময় একটা ছড়ার মধ্য দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে। কারণ বনের এদিকটায় হাঁটার মতো কোনো পথ নেই। কখনো হাঁটুসমান, কখনো তারও বেশি পানির ভেতর দিয়ে হাঁটছি।
বনে এখনো বসন্তে ফোটা ফুল দেখা যাচ্ছে। তবে গ্রীষ্মের বুনো ফুলের প্রাধান্য অনেক। ফুলে ফুলে বিচরণ করছে নানা প্রজাতির পাখি। ফুলে মিষ্টি ঘ্রাণ আমাকে মাতোয়ারা করে দিচ্ছে। বিশেষ করে লবঙ্গলতা ফুলের ঘ্রাণ। ফুলের ঘ্রাণের সঙ্গে যোগ হয়েছে নানা প্রজাতির বুনো পাখির গান। ছড়া দিয়ে ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর একটি বুনো ফুলের গাছের সঙ্গে দেখা হলো। গাছটি থেকে কিছু দুরে দাঁড়ালাম। কারণ এই ফুলে মধু পান করতে বনের মৌটুসি পাখি আসবে। কিছুক্ষণ পর অপূর্ব সুন্দর একটি মৌটুসি চলে এল। তার ঠোঁট সামান্য বাঁকানো। গায়ের পালকে নানা রং এবং পালক আকর্ষণীয়। এটি পুরুষ বেগুনিগলা মৌটুসি। খুব ছোট পাখি। পুরুষ পাখির ওপরের অংশ গাঢ়, তার সবুজ মুকুট, গলা গাঢ় বেগুনি। ওপরের বুক, নিচের বুক এবং ওপরের পেটের পালক উজ্জ্বল লাল। আরও কিছুক্ষণ পর তার প্রেমিকাও হাজির হলো। প্রেমিকার পালক ধূসর বাদামি ও হলুদ। দেখতে তেমন আকর্ষণী নয়। দুজনে ফুল থেকে মধু পান করতে লাগল। পুরুষটি ফাঁকে ফাঁকে গান গাইতে ছিল।
বেগুনিগলা মৌটুসি বাংলাদেশের সুলভ আবাসিক পাখি। এদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আর্দ্র নিম্নভূমির প্রাথমিক বন এবং গৌণ বন। এরা বাংলাদেশের ঘন চিরসবুজ পাহাড়ি বনে বিচরণ করে। বাংলাদেশের বৃহত্তর সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনে প্রধানত দেখা যায়। বেগুনিগলা মৌটুসি সচরাচর জোড়ায় থাকে। তবে একাও চলাচল করে। এরা বৃক্ষ, গুল্ম ও লতানো উদ্ভিদের ফুলে ঘুরে বেড়ায়। ফুলের মধু পান করে। লম্বা ও চিকন চঞ্চু দিয়ে ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে। তারা পোকামাকড়ও ধরে, বিশেষ করে যখন বাসায় ছানা থাকে।
১৭৬০ সালে ফরাসি প্রাণী বিজ্ঞানী মাথুরিন জ্যাকস ব্রিসন ফিলিপাইনে সংগৃহীত একটি নমুনার ওপর ভিত্তি করে বেগুনিগলা মৌটুসির প্রথম বর্ণনা করেন।
এরা বেশ চঞ্চল। ক্ষীণ স্বরে ডাকে। প্রজনন মৌসুমে পুরুষ পাখি বৃক্ষের ডালে বসে সুমধুর সুরে গান গায়। ফেব্রুয়ারি-মে মাসে গাছের ডালে শেওলা ও মাকড়সার জাল দিয়ে ঝুলন্ত বাসা বানিয়ে দুই থেকে তিনটি ডিম পাড়ে। ১৪-১৫ দিনে ডিম ফুটে ছানা বের হয়। নারী ও পুরুষ পাখি মিলে ছানাদের যত্ন নেয়। তবে কেবল মেয়ে পাখি ডিমে তা দেয়। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনে এদের দেখা যায়।
লেখক: নিসর্গী ও পরিবেশবিদ, জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টার