২৫ মার্চ ২০১৬ সালের ঘটনা। পক্ষী আলোকচিত্রী সাজ্জাদ খান রনিকে নিয়ে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে এসেছি। কটেজে ব্যাগপত্র রেখে নাশতা সারলাম। এরপর সকাল সাড়ে ৭টা নাগাদ কটেজের কেয়ারটেকার লাসোর দেওয়া একজন লোক নিয়ে বনের ভেতর ঢুকলাম। বনটিতে আগেও বেশ কয়েকবার এসেছি, তারপরও সঙ্গে একজন স্থানীয় লোক থাকলে পথঘাট চিনতে সুবিধা হয়।
সকাল থেকে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি-প্রাণীর ছবি তুলতে তুলতে বেশ ক্লান্ত। দুপুর আড়াইটা বাজে। এই ৭ ঘণ্টায় হেঁটেছি প্রচুর। বন-টিলা-ছড়া মিলে ৮-১০ কিলোমিটারের কম নয়। শরীরে আর শক্তি নেই। ছড়া থেকে উঠে নতুন একটা প্রজাপতির ছবি তুললাম। এরপর বিচিত্র ধরনের একটি পতঙ্গের ছবি তুলে সঙ্গে থাকা লোকটিকে বললাম, ‘পাখি-প্রাণী-প্রজাপতি তো বেশ তুললাম। এবার একটা সাপ-টাপ কিছু দেখাও।’ সাপ দেখাতে না পেরে লোকটি লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেলল।
এক মুহূর্ত মাত্র অতিবাহিত হলো। লোকটিকে বললাম, ‘থাম, সামনে ওটা কী দেখা যাচ্ছে? তুমি তো দেখাতে পারলে না, এবার আমি দেখাচ্ছি?’ বলেই ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে সমানে ক্লিক করে গেলাম। ছবি তোলার সঙ্গে সঙ্গে ভিডিও করলাম। লাল-ঘাড়ের জলপাই রঙের নলাকার একটি প্রাণী। মাটির ওপর বসা একটি ঝিঁঝি ব্যাঙকে মুহূর্তের মধ্যে ধরে গিলে ফেলল। এতক্ষণ খাদ্য জোগাড়ে ব্যস্ত থাকায় সে আমাদের উপস্থিতি টের পায়নি। কিন্তু টের পেয়েই দ্রুত জঙ্গলের গহিনে হারিয়ে গেল। দুপুর ২টা ৪৩ মিনিট ১২ সেকেন্ড থেকে ২টা ৪৬ মিনিট ২৬ সেকেন্ড পর্যন্ত মাত্র ৩ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের মধ্যেই এত সব কাণ্ড ঘটে গেল। এরপর গাছের ওপর একটি কালি প্যাঁচা দেখে ওর ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে দেখা লাল-ঘাড়ের নলাকার এই প্রাণীটি এ দেশের এক সচরাচর দৃশ্যমান ও প্রায় শঙ্কাগ্রস্ত সরীসৃপ লালডোরা সাপ। এটি লালঘাড় ধোড়া সাপ বা ওরল সাপ নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Red-necked Keelback। কলুব্রিডি (Colubridae) গোত্রের সাপটির বৈজ্ঞানিক নাম Rhabdophis subminiatus (র্যাবডোফিস সাবমিনিয়েটাস)। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সাপটি দেখা যায়।
লালডোরা সাপের চেহারা অত্যন্ত আকর্ষণীয়। পূর্ণবয়স্ক সাপের দৈর্ঘ্য ০.৭৫-১.০ মিটার। তবে সর্বোচ্চ ১.৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। দেহ অপেক্ষাকৃত সরু। দেহের উপরে সবুজাভ-ধূসর বা জলপাই-বাদামি এবং গলার চারদিকটা সিঁদুরে লাল। দেহের নিচটা হলদে, কখনো কখনো পেটের আঁশের বাইরের কিনারায় কালো কালো ফোঁটা থাকে। অপ্রাপ্তবয়স্কগুলো দেখতে ভিন্ন রকম, গলায় হলদে প্রান্তযুক্ত কালো বন্ধনী রয়েছে। চোখগুলো বড় বড়। চোখ দেখলে মনে হবে যেন তাতে কাজল টানা। স্ত্রী সাপ পুরুষের থেকে আকারে বেশ বড় হয়ে থাকে।
এরা চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বন, বনের ফাঁকা স্থান এবং জলা, খাল ও পুকুরের আশপাশের তৃণভূমি, ঝোপঝাড় এবং আবাদযোগ্য জমি বিশেষ করে ধানখেতে বাস করে। প্রধানত স্থলচর হলেও কিছুটা বৃক্ষচারী স্বভাবও রয়েছে। দিন-রাত সব সময়ই সক্রিয় থাকে। উত্তেজিত হলে মাথা ও গলা উঁচু করে গোখরা সাপের মতো ‘ফণা’ তুলতে পারে। খাদ্যতালিকায় রয়েছে ব্যাঙ, গিরগিটি, ছোট ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী, মাছ ইত্যাদি।
সাপটি একদিকে যেমন বিষধর (Venomous), অন্যদিকে বিষাক্ত (Poisonous) অর্থাৎ এটি কামড়ের মাধ্যমে যেমন বিষ প্রয়োগ করতে পারে তেমনি ঘাড়ের নিউকাল গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত বিষের সংস্পর্শে বিষক্রিয়া ঘটাতে সক্ষম। এ ধরনের দ্বৈত বৈশিষ্ট্য অতি অল্পসংখ্যক প্রজাতির সাপে দেখা যায়। এই সাপ সচরাচর কামড়ায় না। তবে জীবন বিপন্ন মনে করলে বাধ্য হয়ে কামড়াতে পারে। যেহেতু এটি ধোড়াজাতীয় সাপ তাই বিষধর সাপের মতো এর বিষদাঁত বা বিষগ্রন্থি নেই। সাপটি যখন কামড়ায়, তখন তার লালগ্রন্থি থেকে নিঃসৃত বিষ সরাসরি দেহে প্রবেশ করে না, বরং ওপরের চোয়ালের পিছনের দাঁতের মাধ্যমে সৃষ্ট সূক্ষ্ম ছিদ্রপথ বেয়ে ধীরে ধীরে প্রবাহিত হয়ে তা আক্রান্তের ত্বক ভেদ করে দেহে প্রবেশ করে। এই বিষ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণসহ অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের জন্য দায়ী। পাশাপাশি বমি বমি ভাব এবং রক্ত জমাট বাঁধায় জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। গবেষণাগারে পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই সাপের বিষ কিডনি বিকল করতে সক্ষম। সুতরাং লালডোরা সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
এই সাপ বিষাক্ত ব্যাঙ খায় এবং সেই ব্যাঙ থেকে প্রাপ্ত বুফোটক্সিন ঘাড়ের উজ্জ্বল লাল বর্ণের অংশে অবস্থিত নিউকাল গ্রন্থিতে সঞ্চিত রাখে। কোনোভাবে যদি সাপটির লালঘাড়ে স্পর্শ লাগে, তাহলে এই গ্রন্থি থেকে বিষ নির্গত হতে পারে। বুফোটক্সিন হৃৎস্পন্দন অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে দেয়, অতিরিক্ত লালাক্ষরণ ও খিঁচুনি ঘটায় এবং পরিণতিতে পক্ষাঘাতের সৃষ্টি করে। ফলে, শুধু কামড় নয়, সাপটির লালঘাড়ের সংস্পর্শেও আক্রান্ত প্রাণী গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে, এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।
এটি ডিমপাড়া (Oviparous) প্রকৃতির সাপ। জুন থেকে জুলাই প্রজননকাল। এ সময় একটি বড় স্ত্রী সাপ একাধিক পুরুষ সাপের সঙ্গে মিলিত হয়। ডিম পাড়ে ৫-১৭টি। সাধারণত আর্দ্র স্থানে, গাছের পচা পাতা বা মাটির নিচে ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে ছানা বের হতে ৫০-৭০ দিন সময় লাগে। সদ্য ফোটা ছানাগুলো সাধারণত ধূসর রঙের হয়, যাদের ঘাড়ে লাল দাগ থাকে। আয়ুষ্কাল ৫-১০ বছর। তবে পরিবেশের অবস্থা ও খাদ্য প্রাপ্যতার ওপর আয়ুষ্কাল অনেকাংশে নির্ভর করে।
লেখক: পাখি-বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়