আজ ১৫ আগস্ট ‘জাতীয় শোক দিবস’। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৯তম শাহাদতবার্ষিকী।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে দুষ্কৃতকারীরা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি, তাদের হাতে একে একে প্রাণ হারিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর সন্তান শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেলসহ পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল।
পৃথিবীর এই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড থেকে বাঁচতে পারেননি বঙ্গবন্ধুর অনুজ শেখ নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত এবং তার ছেলে আরিফ ও সুকান্তবাবু, মেয়ে বেবি, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি এবং আবদুল নাঈম খান রিন্টু ও কর্নেল জামিলসহ পরিবারের ১৬ জন সদস্য ও ঘনিষ্ঠজন। এ সময় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় প্রাণে রক্ষা পান।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর নোবেলজয়ী পশ্চিম জার্মানির নেতা উইলি ব্রানডিট বলেন, মুজিবকে হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না। যে বাঙালি শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারে, তারা যেকোনো জঘন্য কাজ করতে পারে।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক নীরদ সি চৌধুরী বাঙালিদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি বিশ্বের মানুষের কাছে নিজেদের আত্মঘাতী চরিত্রই তুলে ধরেছে।
দ্য টাইমস অব লন্ডন-এর ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট সংখ্যায় উল্লেখ করা হয়- ‘সবকিছু সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে সব সময় স্মরণ করা হবে। কারণ তাকে ছাড়া বাংলাদেশের বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই।’
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই দিনটি জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালিত হতো। এই দিনে সাধারণ ছুটি ঘোষণা থাকত। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে দিবসটি পালন করত। দিবসটি উপলক্ষে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি পালন করত। তবে এবার কিছুটা ব্যতিক্রম।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। এতে করে আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের নেতা ও কর্মীরা আত্মগোপনে চলে যান। এর আগে শোক দিবস উপলক্ষে মাসব্যাপী কর্মসূচি ঠিক করেছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু সরকার পতনের পর মাসব্যাপী কর্মসূচি থেকে বিরত রয়েছে দলটি। তবে ১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে নেতারা দলের অভ্যন্তরে যোগাযোগ বৃদ্ধি করেছেন, অনেকেই এখন প্রকাশ্যেও এসেছেন। যেকোনো মূল্যে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানাতে চান আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। সে লক্ষ্যে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে শোক দিবস শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের বিষয়টি অবহিত করা হয়। ১৫ আগস্ট সকালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জড়ো হবেন দলের নেতা-কর্মীরা। তারা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন। পরে ফাতেহা পাঠ, মোনাজাত ও মিলাদ মাহফিল হবে। একই সঙ্গে রাজধানীর বনানীর কবরস্থানে ১৫ আগস্ট শহিদদের স্মরণে শ্রদ্ধা জানানো হবে। তবে দলীয় নেতা-কর্মীর দ্বারা যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগের ১ নম্বর সাংগঠনিক সম্পাদক আহম্মেদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছে। তার শাহাদতবার্ষিকী অবশ্যই পালিত হবে। ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। এই শোক আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে শক্তি জোগায়। ১৫ আগস্ট নিয়ে নির্দেশনা দেওয়ার কিছু নেই। যারা স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী, বঙ্গবন্ধুর সৈনিক, শেখ হাসিনার কর্মী তারা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে শ্রদ্ধা জানাতে আসবেনই। আওয়ামী লীগ ও সব সংগঠনের নেতা-কর্মীরা সুশৃঙ্খলভাবে শ্রদ্ধা জানাবেন। মিলাদ ও দোয়া মাহফিল কর্মসূচি পালন করবেন। এখন তো পরীক্ষা দেওয়ার সময়, যারা আওয়ামী লীগের খাঁটি কর্মী তারা শ্রদ্ধা জানাবেন। যারা নকল (অনুপ্রবেশকারী) তারা আসবেন না। এখন আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে প্রমাণ করার সুযোগ।
তিনি বলেন, ‘আমরা দলীয়ভাবে প্রশাসনকে অবহিত করেছি। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারীরা শোক দিবসের কর্মসূচি পালন করবেন।’
১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পালনে যারা বাধা দেবেন বা দেওয়ার চেষ্টা করবেন, তাদের (দলের) রাজনীতির দেউলিয়াত্ব প্রকাশ পাবে বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল। বিএনপির দিকে ইঙ্গিত দিয়ে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে দিবসটি পালন করবে। ১৫ আগস্ট ঐতিহাসিক ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ও দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের সব পর্যায়ের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। শ্রদ্ধা জানাতে কেউ বাধা দিলে তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব প্রকাশ পাবে। নেতা-কর্মীরা শান্তিপূর্ণভাবে শোক দিবসের কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।
ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের একাধিক নেতার কাছে ১৫ আগস্ট পালনের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তারা জানান, যেকোনো মূল্যে তারা জাতীয় শোক দিবসে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে শ্রদ্ধা জানাবেন। ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগরের ওয়ার্ডগুলোতে ‘বার্তা’ দেওয়া হয়েছে। টুঙ্গিপাড়ায়ও সংগঠনের নেতা-কর্মীরা শ্রদ্ধা জানাবেন।
এদিকে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা ১৫ আগস্ট পালন করতে নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ জি এম সাহাবুদ্দীন আজম। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘হামলা-মামলায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ভয় পান না। এ দেশের হাল শেখ হাসিনাই ধরবেন। নেত্রী শেখ হাসিনা দ্রুত দেশে ফিরে আসবেন। এখন নেতা-কর্মীদের ১৫ আগস্ট শ্রদ্ধা জানানোসহ নানা কর্মসূচি পালনের নির্দেশনা দিয়েছেন। এসব কর্মসূচিতে আমাদের কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নেবেন।’