প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, জাতিসংঘ বাংলাদেশের সংস্কারে সহায়তা করতে প্রস্তুত।
নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সদর দপ্তরে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ সমর্থন ব্যক্ত করেন।
অন্যদিকে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন প্রধান উপদেষ্টাকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, সংস্কার অভিযানে বাংলাদেশ ইউরোপের সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে পারে। এ ছাড়া জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর), আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রধান ও নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী ডিক শফের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। খবর বাসস ও ইউএনবির।
জাতিসংঘের আবাসিক টিম আপনাকে সহায়তা করতে চায় উল্লেখ করে বৈঠকে জাতিসংঘ মহাসচিব ড. ইউনূসকে বলেন, সদ্য গৃহীত জাতিসংঘের ‘প্যাক্ট অব দ্য ফিউচার’ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এর প্রণোদনামূলক অর্থায়ন দেশটির জন্য বিশেষ সহায়ক হবে। গুতেরেস বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের প্রশংসা করে বলেন, ‘তারা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ এ সময় প্রধান উপদেষ্টা জুলাই-আগস্ট মাসের ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এই আন্দোলন শেখ হাসিনার নির্মম স্বৈরাচারের অবসান ঘটায়। আমি এখানে উপস্থিত হতে পেরেছি, কারণ তরুণরা নতুন বাংলাদেশের জন্য তাদের জীবন উৎসর্গ করেছে।’ বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের ওপর এর প্রভাব, রোহিঙ্গা সংকট এবং জুলাই-আগস্টের গণ-আন্দোলনের সময় সংঘটিত নৃশংসতার তদন্তে জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন অনুসন্ধান মিশনের বিষয়ে আলোচনা হয়।
সংস্কারে ইউরোপের সমর্থন
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, সংস্কার অভিযানে বাংলাদেশ ইউরোপের সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে পারে। বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনে অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তিনি বলেন, ‘গ্লোবাল গেটওয়ের আওতায় স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামো উন্নয়নেও আমরা আপনাদের অংশীদার হিসেবে পাশে আছি। আসুন, আমরা ৪০০ মিলিয়ন ইউরোর বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি সুবিধার সর্বোত্তম ব্যবহার করি।’
নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক
অন্যদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী ডিক শফের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে তিনি এ সাক্ষাৎ করেন। প্রধান উপদেষ্টার অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সাক্ষাতে ড. ইউনূস কৃষি রূপান্তর, পানি ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি মোকাবিলা ও সংস্কার বাস্তবায়নে নেদারল্যান্ডসের সহায়তা কামনা করেছেন।
ড. ইউনূসের সঙ্গে ইউএনএইচসিআর ও আইএলও প্রধানের সাক্ষাৎ
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৃহস্পতিবার একটি হোটেলে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রধানদ্বয় সাক্ষাৎ করেছেন। ইউএনএইচসিআরের হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা করেন।
সংকট মোকাবিলায় একটি নতুন পদ্ধতির আহ্বান জানিয়ে গ্র্যান্ডি বলেন, বাংলাদেশের আশ্রয় শিবিরে থাকা ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার দুর্দশা অবসানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও বেশি কিছু করা উচিত। তিনি বলেন, অধ্যাপক ইউনূস বাংলাদেশের নতুন নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিশ্বব্যাপী আগ্রহ বেড়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় আরও অর্থায়ন হবে। ‘বিশ্বব্যাংকের ৭০০ মিলিয়ন ডলার একটি ভালো সূচনা বিন্দু’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতিসংঘ রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার জন্য আরও সহায়তা করতে প্রস্তুত রয়েছে। অধ্যাপক ইউনূস সংকটের দ্রুত সমাধান খুঁজে বের করার এবং বাংলাদেশের আশ্রয় শিবিরে বেড়ে ওঠা লাখ লাখ রোহিঙ্গা শিশুর ভবিষ্যতের জন্য আরও বেশি কিছু করার ওপর জোর দেন।
অন্যদিকে আইএলও মহাপরিচালক গিলবার্ট হুংবোও একটি হোটেলে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। হুংবো বাংলাদেশে আইএলও কনভেনশন বাস্তবায়নের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপে জাতিসংঘের শ্রম সংস্থার সহায়তার প্রস্তাব দিয়ে বলেন, ‘আমরা আপনার সহায়তায় প্রস্তুত আছি।’ তিনি বলেন, যদি কখনো প্রয়োজন হয় আইএলও তার আহ্বানে সাড়া দেবে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, শ্রম সংস্কার তার সরকারের একটি শীর্ষ অগ্রাধিকার। কেননা তার সরকার এটিকে বাংলাদেশকে বিশ্বমানের উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করার মূল বিষয় হিসেবে দেখে।