বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাতিল করার প্রস্তাব দিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এ বিধান রহিত করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল।
মঙ্গলবার (২৯ অক্টোবর) সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে ফলকার তুর্কের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
এদিকে ঢাকায় শিগগিরই জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের কার্যালয় স্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ। তিনি বলেন, ‘এই কার্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো সরাসরি তদন্ত করতে পারবে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ।’
গতকাল হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা। এই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক। এতে তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামসহ আরও দুই উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমিন মুরশিদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘বৈঠকে একটা খুব বড় সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের কার্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার সম্মতি দিয়েছে। শিগগিরই এই কার্যালয় প্রতিষ্ঠা হবে। ঢাকায় কার্যালয় থাকা মানে মানবাধিকারের জায়গা থেকে আমাদের শক্তি বাড়ল। দেশে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে, চলে যায়, কিন্তু তাদের নিজেদের অপরাধের তদন্ত হয় না।’
বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা দেখছেন এবং বর্তমান পরিস্থিতিকে তারা কীভাবে দেখছেন, সে ব্যাপারে জানতে চেয়েছেন সফররত জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা। এ বিষয়ে শারমিন মুরশিদ বলেন, ‘আমরা প্রত্যেকে যার যার ক্ষেত্র থেকে বলেছি, চ্যালেঞ্জগুলো কী এবং জাতিংসংঘ কোন কোন ক্ষেত্রে আমাদের পাশে দাঁড়াতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব, মানবাধিকার যেন লঙ্ঘিত না হয়। তারা এ ক্ষেত্রে সহায়তামূলক অবস্থান থেকে ঢাকা সফরে এসেছেন।
এ ছাড়া সফরের প্রথমদিনে জাতিসংঘ প্রতিনিধিদল প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টে তার দপ্তরে বৈঠক করে। এর আগে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে সচিবালয়ের কার্যালয়ে বৈঠক করেন।
প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে কিছু না জানানো হলেও সচিবালয়ে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের সঙ্গে বৈঠক শেষে প্রতিনিধিদলের নেতা ফলকার তুর্ক বলেন, ‘বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্কারকাজে মানবাধিকার যাতে নিশ্চিত হয় সে বিষয়ে কথা হয়েছে। জুলাই গণহত্যার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি এটা নিয়ে কাজ করছে।’
পরে উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের বলেন, ‘ফ্যাসিস্টদের বিচার সম্পন্ন করার আগে বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধান পরিবর্তনের প্রশ্নই ওঠে না। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন ব্যক্ত করেছেন ফলকার তুর্ক। তিনি বিচার বিভাগ স্বাধীন করার কথা বলেছেন। তাকে বলেছি, আমরা কাজ করে যাচ্ছি। অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও মৃত্যুদণ্ডের বিধান রহিত করা যায় কি না বলেছেন। আমরা বলেছি, ফ্যাসিস্টদের বিচারের আগে এটি পরিবর্তনের প্রশ্নই আসে না।’
জাতিসংঘ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘বৈঠকে মানবাধিকার প্রতিনিধিদল জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের পাঠানোর ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে যাচাই-বাছাই ও স্ক্রিনিং করে পাঠানোর পরামর্শ প্রদান করেছে। তবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ যে ভালো পারফর্ম করছে, সে বিষয়ে তারা প্রশংসা করেছে। তা ছাড়া পুলিশ সংস্কার কমিশনে মানবাধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি যেন গুরুত্ব প্রদান করা হয় সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। অধিকন্তু তারা আমাদের বিচার প্রক্রিয়ায় সাক্ষী সুরক্ষা ও ভিকটিম সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে নিশ্চিতকরণের পরামর্শ প্রদান করেন।’
উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের সর্বাত্মক সহযোগিতা চেয়েছি। যদিও জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন ও প্রত্যাবাসন বিষয়ে সাহায্য করছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় এটি অনেক কম। সে জন্য জাতিসংঘ প্রতিনিধিদলকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণে চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছি।’
ঢাবিতে ভলকার তুর্ক
দুই দিনের সফরে এসে প্রথম দিনই সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সমন্বয়কারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন জাতিসংঘের (ইউএন) মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক। মতবিনিময়ে মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, নাগরিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং উত্তরণের প্রক্রিয়াগুলোতে অন্তর্বর্তী সরকারকে সহায়তা করার কথা জানিয়েছেন জাতিসংঘের এই প্রতিনিধি।
গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ওই মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়। মতবিনিময়ে ফলকার তুর্ক বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ও অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সামনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি দীর্ঘস্থায়ীভাবে মোকাবিলা করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
মানবাধিকারের ওপর ভিত্তি করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কার্যকর করতে হবে। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সাংবাদিক, শ্রমজীবী, সমাজকর্মী ও অন্যান্য মানবাধিকার রক্ষকদের নির্বিঘ্নে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য একটি উন্মুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন। বাংলাদেশের তরুণদের সংগ্রামের সাহসিকতা এবং আত্মত্যাগ আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। এই তরুণদের যাত্রাপথের সঙ্গী হতে এবং সমর্থন করতে আমরা প্রস্তুত। তথ্য অনুসন্ধান বা ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের মাধ্যমে তরুণদের সঙ্গে ইতোমধ্যে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছে।’
সভায় ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংঘটিত জুলাই-আগস্টের নৃশংস ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতোমধ্যেই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে এই তদন্ত কমিটি জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান দলকে সম্ভাব্য সব সহযোগিতা প্রদান করবে।’
এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদসহ ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী কার্যালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গণ-অভ্যুত্থানের সময় তরুণদের আঁকা দেয়াললিখন ও গ্রাফিতি পরিদর্শন করেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক এ হাইকমিশনার।