বিগত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কেন এত বিতর্ক, কেন তারা সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারেননি, পেছনের রহস্য কী ছিল, অন্তরায়গুলো কেমন ছিল? এসব জানতে সাবেক তিন প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ডেকে জানতে চাইতে পারে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন। একই সঙ্গে নির্বাচনি অপরাধগুলো যেন তাদের জন্য প্রযোজ্য হয় সরকারের কাছে সেই সুপারিশ করার কথাও ভাবছে কমিশন।
বৃহস্পতিবার (২১ নভেম্বর) গণমাধ্যমের সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে এমন পরিকল্পনার কথা সাংবাদিকদের জানান নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার। একই সঙ্গে বিগত তিন নির্বাচনের বিতর্কিত নানা দিক তুলে ধরে গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সঙ্গে এই বৈঠকে আজকের পত্রিকার সম্পাদক গোলাম রহমান, খবরের কাগজ পত্রিকার সম্পাদক মোস্তফা কামাল, যুগান্তরের সম্পাদক সাইফুল আলম, কালের কণ্ঠের সম্পাদক হাসান হাফিজ, প্রথম আলোর যুগ্ম-সম্পাদক ও কবি সোহরাব হাসান, প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, দেশ রূপান্তর পত্রিকার সম্পাদক মোস্তফা মামুন, বাসসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব মোর্শেদ, সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল, গোলাম মোর্তোজাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকরা বক্তব্য রাখেন।
বৈঠকের বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদকরা পরে জানান- তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন, নারী আসনে সরাসরি ভোট, জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করা, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন, জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে ভোটার তালিকা প্রস্তুত, ভোটকেন্দ্রে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাসহ কমিশনের কাছে তারা বেশ কিছু প্রস্তাব তুলে ধরেছেন।
কমিশনপ্রধানের কাছে সাংবাদিকরা জানতে চান- গত তিন কমিশনকে সংস্কার কমিশন ডাকবে কি না, তাদের সময় যে অনিয়ম হয়েছে তা শুনবেন কি না, জবাবে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘সাবেক তিন কমিশন নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। আমরা আবার পর্যালোচনা করছি। নির্বাচনি অপরাধগুলো তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। আর এটা যাতে ভবিষ্যতে না হয়, সেটি নিয়েও আমরা পর্যালোচনা করেছি। আমরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য কতগুলো নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ করতে চাই। গণমাধ্যমও যেন গত তিন নির্বাচনে কী অনিয়ম হয়েছে, তারা কেন সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারেনি, সেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করে। আমরাও তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি। গত তিন নির্বাচন পর্যালোচনা করে ওই শিক্ষা নিয়ে আমরা প্রস্তাব করব।’ আপনারা তাদের ডেকে জানতে চাইবেন কী? উত্তরে ড. মজুমদার বলেন, ‘উনারা কি আসবেন? আমার তো মনে হয় না। আমরা বিবেচনায় নেব।’
সম্পাদকদের সঙ্গে আলোচনা প্রসঙ্গে ড. বদিউল আলম বলেন, ‘আমরা যে বিষয়গুলোর কথা ভাবছিলাম, ওনারা সেগুলোর ওপর জোর দিয়েছেন। আমরা মনে হয়, আমরা সঠিক পথেই আছি। নারীর ক্ষমতায়ন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন, সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নারী আসন, স্থানীয় নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের আগে করার প্রস্তাব এসেছে। ওনারা আমাদের প্রশংসা করেছেন, রিপোর্টটি প্রকাশ করার কথাও বলেছেন।’
বৈঠকের বিষয়ে ডেইলি স্টার বাংলার সম্পাদক গোলাম মোর্তোজা বলেন, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের উচিত গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে অনিয়মের জন্য দায়ীদের শাস্তির সুপারিশ করা। নির্বাচনে অনিয়মে জড়িতদের ‘নির্বাচনি অপরাধী’ আখ্যা দিয়ে তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার সুপারিশ করার আহ্বান জানান তিনি। এ ছাড়া সংসদের নারী সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন করার ও আসনসংখ্যা ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করার আহ্বান জানান। সংস্কার কমিশনকে পূর্ববর্তী তিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার- কাজী রকিবউদ্দিন আহমেদ, কে এম নুরুল হুদা ও কাজী হাবিবুল আউয়ালকে জিজ্ঞাসাবাদ করার দাবি জানান তিনি। সাবেক তিন নির্বাচন কমিশনারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ‘ভোটারবিহীন’ ও ‘রাতের ভোটের’ নির্বাচনের পেছনের কারণ বের করার এবং সে অনুযায়ী সামনের নির্বাচনের বিধিমালা সাজানোর সুপারিশ করেন তিনি।
প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, আমার প্রস্তাব হচ্ছে অনাবাসী প্রতিনিধিত্ব হবে না। ঢাকায় থেকে খাগড়াছড়ি বা দিনাজপুরের প্রতিনিধিত্ব করবে না। এটা হলে ওই এলাকার জনগণকে বঞ্চিত করা হবে। নির্বাচনে টাকার খেলা বন্ধ করতে রাষ্ট্রীয় খরচে নির্বাচনী প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। নারী আসনে সরাসরি ভোট হতে পারে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে। অথবা তিনটি আসন মিলে একটি নারী আসন হবে, যেখানে সরাসরি নির্বাচন হবে। সব নাগরিক যাতে তার পছন্দের প্রার্থী বাছাই করতে পারে সেটা আমাদের চাওয়া।
প্রতিটি নির্বাচনে গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের অবাধে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান আজকের পত্রিকার সম্পাদক গোলাম রহমান। তিনি বলেন, প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হলে অনেক আগে থেকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য আইনের পরিমার্জন, পরিবর্ধন করতে হবে। দলীয় সরকারের অধীনে অতীতে দেখেছি যেভাবে প্রভাবিত করা হয়, সেই সুযোগ যেন না থাকে। সমানুপাতিক নির্বাচন এই সময়ে তো সম্ভব না। এটা সংসদ থেকে করতে হবে। কেননা, সেখান থেকে করতে না পারলে কার্যকর হবে না।
সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, নির্বাচন সংস্কার কমিশনের কাছে আমি দুটো পরামর্শ দিয়েছি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনও তাদের অধীনে হবে কিনা। তারা বলেছেন, এটি নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। আমি মনে করি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনও রাজনৈতিক সরকারের অধীনে না হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করা যেতে পারে। ভোটার তালিকা করা সময় এবং অর্থের অপচয় মনে হয়। ভোটার তালিকা করার সময় এনআইডি কার্ড ব্যবহার করা হয়, সেটিকেই কেন আমরা ভোটার কার্ড হিসেবে ব্যবহার করি না।
প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক মোস্তাফিজ শফি বলেন, সবার আগে তত্ত্বাবধায়ক পুনর্বহাল করতে পারলে দলীয় সরকারের অধীনে যে সমস্যা হয়, তার ৮০ শতাংশ থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব। এটা সবার আগে ভাবতে হবে। এর সঙ্গে সংবিধান সংস্কার কমিশনকেও ভাবতে হবে। তাদের প্রস্তাব সরকারকে দেওয়ার পাশাপাশি গণমাধ্যমকেও দেওয়ার জন্য। এতে দলগুলো বা সরকার কতটুকু মানল তা আমরা জানতে পারব। আরেকটা বিষয় হলো নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন দিতে হবে। ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে ১০০ আসনে নির্বাচন হবে। প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া গণমাধ্যমকর্মী ছাড়াও যারা ভোটের দায়িত্ব পালন করেন, তাদের আগাম ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ড হয়েছিল। সে নির্বাচনে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো অংশ নেয়নি। সিইসি কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশনের অধীনে ২০১৮ সালের নির্বাচনে ‘রাতের ভোট’ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও আসন পেয়েছিল পাঁচটি। আর জোট হিসেবে পেয়েছিল ৭টি আসন। আর সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন কমিশনের অধীনে ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো ভোটে অংশ নেয়নি। ভোটের ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে অধিক ভোট পড়ার হার দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।
এলিস/এমএ/