২০২৪ সালে দেশের চার জেলায় পাঁচজন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের সবাই মারা গেছেন। মৃতদের মধ্যে দুজন শিশু, তিনজন পুরুষ। দুজনের বয়স ৩৮ বছর, একজনের বয়স ২৫ বছর। শিশুদের মধ্যে একজন মেয়ে (৩) ও একজন ছেলে (৬)। এদের মধ্যে চারজনের মৃত্যুর আগেই নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হয়। একজনের শনাক্ত হয় মৃত্যুর পর। এ বছরই প্রথমবারের মতো মৃত ব্যক্তির শরীরের নমুনা থেকে নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। এর আগে ২০২৩ সালে মায়ের বুকের দুধে নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছিল।
বৃহস্পতিবার (১৯ ডিসেম্বর) সকালে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) মিলনায়তনে নিপাহ ভাইরাসের বিস্তার এবং ঝুঁকি বিষয়ে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন এসব তথ্য জানান।
তিনি জানান, এ বছর যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে তাদের মধ্যে দুজন মানিকগঞ্জ সদরের, একজন শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার, একজন নওগাঁর পোরশা উপজেলার এবং একজন খুলনার দাকোপের বাসিন্দা ছিলেন।
ডা. তাহমিনা শিরীন বলেন, নিপাহ একটি প্রাণঘাতী ভাইরাস। এ ভাইরাসের বাহক টেরোপাস (ফল আহারি) গোত্রীয় বাদুড়। বাদুড় থেকে মানুষে এই রোগের সংক্রমণ হয়। বাদুড়ের মুখের লালা বা মলমূত্র ছড়িয়ে থাকা খেজুরের রস বা তালের রস খাওয়ার মাধ্যমে নিপাহ ভাইরাস ছড়ায়। নিপাহ ভাইরাসের কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাব্যবস্থা বা প্রতিষেধক নেই। প্রতিরোধই একমাত্র পন্থা। মানুষের মধ্যে এ ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় মালয়েশিয়ায়, ১৯৯৮ সালে। বাংলাদেশে ২০০১ সালে মেহেরপুর জেলায় নিপাহ ভাইরাসের প্রথম প্রাদুর্ভাব চিহ্নিত হয়। এরপর থেকে প্রায় প্রতিবছরই বাংলাদেশে এই রোগের প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত দেশের ৩৪ জেলায় নিপাহ ভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয়েছে। এই রোগে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুহার ৭১ শতাংশের বেশি। আর চলতি বছরে মৃত্যুহার শতভাগ।
তিনি জানান, দেশে ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩৪৩ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে; যার মধ্যে ২৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশে শীত মৌসুমে ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়।
এ রোগের প্রধান লক্ষণসমূহ সম্পর্কে তিনি বলেন, জ্বরসহ মাথাব্যথা, খিঁচুনি, অজ্ঞান হওয়া, মানসিক অবস্থার পরিবর্তন (আবোলতাবোল বলা/ভুল বলা), কোনো কোনো ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট। বাংলাদেশে মানুষ থেকে মানুষের মধ্যে নিপাহ ভাইরাস ছড়ানোর নজির রয়েছে; যা শতকরা ২৮ ভাগ।
ডা. তাহমিনা শিরীন জানান, ২০২৩ সালে ১৩ আক্রান্ত রোগীর মধ্যে ১০ জন মারা যায়। বাংলাদেশের বাইরে ভারতের কেরালায় নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে। ২০২৪ সালে কেরালায় দুজন আক্রান্ত হয় এবং দুজনই মারা যায়। ভারতে ২০০১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৭৪ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। রোগী অনুপাতে মৃত্যুহার প্রায় ৭৩ শতাংশ। উল্লেখ্য, কেরালায় গ্রীষ্মকালে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা যায়।
টেলিফোনের মাধ্যমে ২০২২ ও ২০২৩ সালে বাংলাদেশে খেজুরের কাঁচা রস খাওয়ার তথ্য সংগ্রহ করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ ৫৭ শতাংশ, রাজশাহী বিভাগে ৫১ শতাংশ, ঢাকা বিভাগে ৩১ শতাংশ মানুষ খেজুরের কাঁচা রস পান করার ইতিহাস পাওয়া গেছে। সভার শুরুতে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. আহমেদ নওশের আলম স্বাগত বক্তব্য রাখেন।