কারামুক্ত হয়ে বাইরে অবস্থান করা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কোথায় কে কী করছেন তা জানতে অন্তত তিনটি পন্থায় গোয়েন্দারা নজরদারি চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে কেউ কেউ আন্ডারওয়ার্ল্ডে ফের তৎপরতা শুরু করেছেন বলেও খবর পাচ্ছেন গোয়েন্দারা। তাদের মধ্যে অন্তত দুজন শীর্ষ সন্ত্রাসী বর্তমানে গোয়েন্দাদের নিবিড় নজরদারির মধ্যে আছেন।
এই বিষয়ে মঙ্গলবার (১৪ জানুয়ারি) দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবি প্রধান রেজাউল করিম মল্লিক বলেছেন, জামিনে কারামুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল ও শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনকে দ্রুতই আইনের আওতায় আনা হবে। কেবল এই দুজন নয়, শীর্ষ সন্ত্রাসী যারা বাইরে আছেন (কারাগারের বাইরে) তাদেরকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও আনুষ্ঠানিক ওই সংবাদ সম্মেলনে ডিবি প্রধান জানিয়েছেন, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিগত (সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত) চব্বিশ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে মোট ২৭ জন এলাকাভিত্তিক চিহ্নিত সন্ত্রাসীকে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, গত ১০ জানুয়ারি রাতে এলিফ্যান্ট রোডে ব্যবসায়ী নেতা এহতেশামুলকে কুপিয়ে মারাত্মক জখমের ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে ওই দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল ও ইমনের নাম আসে। এরপর আরও নড়েচড়ে বসেছে ডিএমপির বিভিন্ন ইউনিট। শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ এলাকাভিত্তিক চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গতিবিধির ওপর নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইনি প্রক্রিয়ায় বা সুযোগ নিয়ে দফায় দফায় মুক্তি পেয়েছে বেশ কয়েকজন কারাবন্দি শীর্ষ সন্ত্রাসী। যাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন- ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ইমন, আব্বাস আলী ওরফে কিলার আব্বাস, শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম, খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন ও খোরশেদ আলম ওরফে রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসু অন্যতম। কিন্তু তারা এখন কে কোথায়? তারা কি সুস্থ-সুন্দর জীবন যাপন করছেন, নাকি আন্ডারওয়ার্ল্ডে সক্রিয় হয়েছেন? এমন নানা প্রশ্ন এখন অপরাধ বিশ্লেষকসহ সাধারণ মানুষের মনেও ঘুরপাক খাচ্ছে।
এ বিষয়ে মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের উপকমিশনার পদমর্যাদার দুইজন কর্মকর্তার সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়।
আলাদাভাবে কথা হলেও তাদের বক্তব্য বা মন্তব্য ছিল প্রায় অভিন্ন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই দুই কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি, এলাকাভিত্তিক অপরাধ পর্যবেক্ষণ ও নিজস্ব গোপনীয় মাধ্যম ব্যবহার করে ওই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গতিবিধি নজরদারি করা হচ্ছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, ‘প্রতিটি সংস্থারই তদন্তসহ বিশেষ বিষয়গুলোতে নিজস্ব গোপনীয় কিছু কর্মকৌশল থাকে, যা প্রকাশ্যে আনা হয় না অথবা প্রকাশ করাও উচিত নয়। কেননা, অপরাধীরা গোয়েন্দাদের কৌশল জেনে গেলে ভিন্ন কোনো উপায় বের করে তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করবে।’
কর্মকর্তারা বলেন, এ শীর্ষ সন্ত্রাসীরাও নিত্য-নতুন কৌশলে চাঁদাবাজিসহ নানা কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তারা হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রাম অ্যাপস ব্যবহার করছে। সেই অ্যাপসগুলো সক্রিয় রাখা হয়েছে অধিকাংশই বিদেশি নম্বর দিয়ে। তারপরও সম্ভাব্য সবরকম প্রচেষ্টায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গতিবিধিতে চোখ রাখা হচ্ছে।
২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম প্রকাশ করে। তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে বেশির ভাগই দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মারা গেছেন। অনেকে আবার বিভিন্ন মামলায় দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন। তাদের মধ্যে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদের ক্ষমতাকালে তার দুই ভাই হারিছ আহমেদ ও তোফায়েল আহমেদ ওরফে জোসেফের সাজা মওকুফ এবং এনআইডি জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। এরপরও যারা কারাগারে ছিলেন তাদের মধ্যে অনেকেই ৫ আগস্টের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে জামিনে বের হয়েছেন।
কোনো সন্ত্রাসী আইনের হাত থেকে রক্ষা পাবে না: ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) প্রধান রেজাউল করিম মল্লিক বলেছেন, জামিনে কারামুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল ও আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনকে দ্রুতই আইনের আওতায় আনা হবে। গতকাল মঙ্গলবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
এক প্রশ্নের জবাবে রেজাউল করিম মল্লিক বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে স্বাভাবিক থাকে সে বিষয়ে আমরা বিশেষ নজর দিচ্ছি। কোনো সন্ত্রাসী আইনের আওতা থেকে রক্ষা পাবে না। সে পিচ্চি হেলাল হোক বা ইমন হোক। তাদের আইনের আওতায় আনতে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। অবশ্যই তারা গ্রেপ্তার হবেন।’
ডিবিপ্রধান তার বক্তব্যে বলেন, কোনো চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারীদের ঠিকানা এই দেশে হবে না। পুলিশ তাদের কঠোর হাতে দমন করবে। রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গায় গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। গেল ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ২৭ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ। এ সময় বন্দুক, বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও গুলি উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘কোনো অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে আমি ব্যক্তিগতভাবে রক্তচক্ষুকে ভয় পাই না। যতদিন কাজ করব ততদিন দেশ ও জনগণের সেবার মানসেই থাকব। অন্যায়ের কাছে কোনোদিন মাথা নত করিনি, ভবিষ্যতেও করব না। আমার হারানোর কিছু নেই। দীর্ঘ ১৮ বছর পুলিশে যে অত্যাচার, নির্যাতন সহ্য করেছিলাম তা থেকে ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতা আমাদের মুক্ত করেছে। এ জন্য ছাত্র-জনতার কাছে আন্তরিক কৃতজ্ঞ।’
এ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ডিবির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের দক্ষিণের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ, গোয়েন্দা উত্তর বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ রবিউল হোসেন ভূঁইয়া, তেজগাঁও গোয়েন্দা বিভাগের (ডিসি) মিজানুর রহমান এবং ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান।