ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিশেষ পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। বিগত সময়ে বিভিন্ন অনিয়মের কারণে দেশের নানা বিষয়ে সংস্কারের জোর দাবি ওঠে। সেই কারণেই দুই দফায় মোট ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। যার মধ্যে সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, দুর্নীতি ও পুলিশ ব্যবস্থা সংস্কার বিষয়ে গঠিত কমিশন আজ প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেবে। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমনে প্রায় ৫০টি প্রস্তাব এবং পুলিশ প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিতের বিষয়টি স্ব স্ব কমিশনের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে বলে জানা গেছে।
তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সংস্কারের বিশাল কর্মযজ্ঞ কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে নানান ধরনের মন্তব্য আসছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক মনে করেন, এই সংস্কার কাজের গতিপ্রকৃতি সময়ই বলে দেবে। তবে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য বর্তমান সময়কে সেরা সুযোগ হিসেবে দেখছেন অন্য বিশ্লেষকরা।
কমিশনের একাধিক সদস্য জানান, সংস্কার কমিশনগুলো নিজ নিজ ক্ষেত্রে বেশকিছু মৌলিক পরিবর্তন আনার প্রস্তাব দেবে। সেগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তাদের প্রতিবেদনে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি দুই ভাগে সুপারিশমালা তুলে ধরা হবে। সেগুলোর মধ্যে কিছু সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়নের পরামর্শ দেওয়া হবে।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই তার কমিশনের লক্ষ্য। সে কারণে অসংগতিপূর্ণ বেশকিছু বিভাগে মৌলিক পরিবর্তন আনার সুপারিশ করবেন। সেই পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশে একনায়কতন্ত্র বা এক ব্যক্তির ক্ষমতায়ন রোধ করে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা সম্ভব হবে।
এই কমিটির খসড়া প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ ব্যবস্থা, সংসদের আকার বৃদ্ধি করে ৫০৫টিতে উন্নীত করা, সংসদে নারীদের সম্মানজনক প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, গণভোট ফিরিয়ে আনা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনাসহ আরও বেশকিছু বিভাগে পরিবর্তন আনার প্রস্তাব দেওয়া হবে।
অপরদিকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ ব্যবস্থার বিষয়টি নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশেও গুরুত্ব পাচ্ছে বলে কমিশন প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, ক্ষমতা, ইসির দায়বদ্ধতা; সিইসি ও ইসি নিয়োগ; এ ক্ষেত্রে সার্চ কমিটিতে সংসদের বিরোধী দল এবং তৃতীয় বৃহত্তম দলের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা; নির্বাচন বাতিল করার বিষয়, রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ, ভোটের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ১৯৯১ বিশেষ আইন, নির্বাচনি অপরাধ; সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ; নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, গণমাধ্যম নীতিমালা; নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ, সংসদীয় আসন সংখ্যা বাড়ানো, নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন, ‘না’ ভোটের বিধান, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনপদ্ধতি ও গণভোটসহ নানা বিষয়ে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হবে।
দুর্নীতি দমনে আসছে ৫০ প্রস্তাব
রাষ্ট্র কাঠামো, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সব ক্ষেত্রে দুর্নীতি কমাতে ৫০টির বেশি প্রস্তাব দেবে বলে খবরের কাগজকে জানিয়েছেন দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. মো. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনকে কার্যকর করতে প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধাচার খুব জরুরি। সে জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ থাকবে। দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে দুদকের পাশাপাশি সহযোগী হিসেবে যেসব সংস্থা কাজ করে সেগুলোরও সম্পূরক সংস্কার প্রয়োজন। পাশাপাশি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিবর্তন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঠিক পথে আনতে দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশন কাজ করবে।
পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিতে সুপারিশ
জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি, হামলা ও হত্যার সঙ্গে পুলিশের বিভিন্ন স্তরের সদস্যরা জড়িত থাকায় নানা সমালোচনা হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদেরকে পেশাদার আচরণের পরিবর্তে দলীয় কর্মীর ভূমিকায় দেখা গেছে। এ নিয়ে খোদ পুলিশের সদস্যরাও সংস্কার চেয়েছেন। বিষয়গুলোকে সামনে রেখে পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান সফর রাজ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, প্রশাসনের আইনি কাঠামো সংস্কার, পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, পুলিশের পেশাদারি দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পুলিশের কল্যাণসংক্রান্ত কার্যক্রম ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হবে।
সুপারিশমালায় আরও থাকবে- পুলিশের অপারেশনাল ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বিষয়ে অধিকতর উন্নতমানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, অপরাধ তদন্তে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিটের (বিশেষ শাখা, ট্যুরিস্ট পুলিশ, নৌ-পুলিশ, অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট, রেলওয়ে পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ, সিআইডি, পিবিআই ইত্যাদি) পেশাদারি দক্ষতা বৃদ্ধিতে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ করা।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত পড়ুন নিচের লিঙ্কে-
>কীভাবে বাস্তবায়ন সময় গেলে বোঝা যাবে
>সংসদে অনুমোদন ছাড়া বৈধ হবে না
>সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হবে