ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) কেনায় নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে অনিয়ম ও রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
রবিবার (২৬ জানুয়ারি) ইসিতে অভিযান শেষে দুদকের সহকারী পরিচালক নুর আলম সিদ্দিকি জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে ইভিএম কেনাসহ প্রকল্পের কার্যক্রমে অনিয়মের সত্যতা পেয়েছেন।
তবে এ বিষয়ে ইসির ইভিএম প্রকল্পের পরিচালক কর্নেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, প্রকল্পের ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম চিত্র তিনি দেখেছেন, তবে আর্থিক দুর্নীতির কোনো ঘটনা চোখে পড়েনি।
দুদকের তিন সদস্যের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম ইসি সচিবালয়ে গিয়ে সংস্থাটির ইভিএম কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং অনিয়মের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে। এর আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিমের সদস্যরা ইসি সচিবালয়ে গিয়ে সংস্থাটির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ, পরিকল্পনা শাখার কর্মকর্তাসহ প্রকল্পসংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে কথা বলেন এবং ভবনটির আন্ডারগ্রাউন্ডে রক্ষিত ইভিএমগুলো পর্যালোচনা করেন।
তদন্ত শেষে দুদকের সহকারী পরিচালক নুর আলম সিদ্দিকি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইসির কাছে নিম্নমানের মেশিন কেনার বিষয়ে আমরা কিছু তথ্য ও কাগজপত্র সংগ্রহ করেছি। এই প্রকল্প সংশ্লিষ্ট আরও রেকর্ডপত্র সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে চাওয়া হয়েছে। সেগুলো পেলে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।’
কী ধরনের তথ্য পেলেন জানতে চাইলে দুদক সহকারী পরিচালক বলেন, ‘রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ইসি তিন জায়গায় ইভিএমগুলো সংরক্ষণ করেছে। তার মধ্যে রয়েছে ইসির আঞ্চলিক ১০টি কার্যালয়, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি ও নির্বাচন কমিশন ভবনের নিচতলা। ইসিতে থাকা ৬১৮টি ইভিএমের মধ্যে তাৎক্ষণিক তিনটি মেশিন অপারেশনাল ক্যাপাসিটি আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি। তার মধ্যে যাচাইকালে একটি মেশিনে যান্ত্রিক ত্রুটি পাওয়া যায়, যা নিম্নমানের মেশিন কেনার ইঙ্গিত বহন করে। আর বাকি দুটি মেশিন সচল। এ ছাড়া ৮৬ হাজার ইভিএম বিএমটিএফ এবং বাকি ৬২ হাজার মেশিন আঞ্চলিক অফিসে সংরক্ষণ করা আছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আমাদের জানিয়েছেন। পরে নিম্নমানের মেশিন কেনাসহ অভিযোগসংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে আমরা কিছু রেকর্ড সংগ্রহ করেছি। বাকি আরও কিছু রেকর্ডপত্র চেয়েছি। পরবর্তী সময়ে সব ধরনের রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে আমরা কমিশনের কাছে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করব। কমিশন জানিয়েছে, তারা তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করবে। এ জন্য যদি আইটি এক্সপার্ট প্রয়োজন হয়, তাদের নিয়োগ দেওয়া হবে।’
দুদকের তদন্তের বিষয়ে ইসির ইভিএম প্রকল্পের পরিচালক কর্নেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান খবরের কাগজকে জানান, রবিবার তিনি অফিসে না থাকায় দুদকের ওই কর্মকর্তার সঙ্গে তার ফোনে কথা হয়েছে। তার টিমের সদস্যরা দুদকে কাছে তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করেছেন।
দীর্ঘদিন এই প্রকল্পে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে আপনি কি কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি দেখেছেন? এমন প্রশ্নে প্রকল্পের পরিচালক বলেন, ‘এই প্রকল্পের জন্য ২০১৮ সালে ১ লাখ ৫০ হাজার ইভিএম কেনা হয়েছিল। প্রকল্পের কার্যক্রম শুরুর ৫ বছর পর দায়িত্ব নিই। কাজেই কেনাকাটায় আর্থিক অনিয়ম হয়েছে কি না, আমার জানা নাই। তবে এত দাম দিয়ে কেনা ইভিএমগুলো সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক অনিয়ম আমি দেখেছি। যেমন: ১৫০০-এর মতো ইভিএম চুরি/হারিয়েছে, আগুনেও কিছু পুড়েছে আর রাখার জায়গার সংকট ও রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি ছিল। সেগুলো সমাধানে কমিশনকে বারবার তাগিদও দিয়েছি। তাতে খুব বেশি কাজ হয়নি। ফলে অযত্ন-অবহেলায় সংগৃহীত ইভিএম মেশিনগুলোর মধ্যে ১ লাখের বেশি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।’
উল্লেখ্য, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ২০১৮ সালের প্রকল্পের অর্থ ছাড়ের আগেই তড়িঘড়ি করে ১ লাখ ৫০ হাজার ইভিএম কেনার সিদ্ধান্ত নেয় কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে ১ লাখ ৫ হাজার টাকা দরে ৮০ হাজার ইভিএম কেনে তারা। ওই সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ইভিএমের বিরোধিতা করলেও পিছু হটেনি নূরুল হুদার কমিশন। এই প্রকল্পের জন্য সরকার বরাদ্দ দেয় ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। কেনা ইভিএমগুলোর কার্যকালের মেয়াদ ১০ বছর বলা হলেও অব্যবস্থাপনা আর অযত্নে মাত্র তিন বছরেই সেগুলো অকেজো হতে শুরু করে। সর্বশেষ গত বছরের ৩০ জুন এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে তা পুরোপুরি বাতিল করে বিগত সরকার। এতে রাষ্ট্রের ক্ষতি হয় প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।