দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দরের শেড ও ইয়ার্ডে থাকে শত শত কোটি টাকার পণ্য। সেখানে রয়েছে প্রায় দেড় হাজার সিসি ক্যামেরা। গেট পাস ছাড়া কারও সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশের সুযোগ নেই।
বন্দরের ভেতরে চোর ধরার জন্য যে ওয়াচ টাওয়ার তৈরি করা হয়েছে, সেই টাওয়ারের মাধ্যমে ঘটেছে পণ্য চুরির ঘটনা। সব নিরাপত্তা বলয় ডিঙিয়ে বন্দরের ভেতরে সুরক্ষিত এলাকায় চুরির ঘটনায় বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
গত ২৬ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে বন্দরের ভেতরে এবি ইয়ার্ড সংলগ্ন এলাকা থেকে এক বস্তা স্ক্র্যাপ মালামাল চুরির ঘটনা ঘটে। পণ্য চুরির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, চট্টগ্রাম মহানগরীর বারেক বিল্ডিং মোড়ের কাছে বন্দরের সংরক্ষিত এলাকার একটি ওয়াচ টাওয়ারের ওপর থেকে এক ব্যক্তি বস্তাভর্তি পণ্য বন্দরের সীমানার বাইরে ছুড়ে মারছিলেন। দেয়ালের বাইরে বিমানবন্দর সড়কের ফুটপাতে অবস্থানকারী সহযোগী চোর পণ্যগুলো কুড়িয়ে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে গত মঙ্গলবার রাতে আঙুল কাটা মইন (৪১), আক্তার মিয়া (৪২) ও চিকন আলী নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে বন্দরের নিরাপত্তা বিভাগ। তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে চুরি যাওয়া স্ক্র্যাপ মালামালের আংশিক উদ্ধার করা হয়। আসামিদের গ্রেপ্তার এবং মালামাল উদ্ধার করে বন্দর থানায় হস্তান্তর করার পাশাপাশি মামলা করা হয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত তিনজন গ্রেপ্তার হলেও বন্দরের ভেতরের কেউ জড়িত আছে কি না তা খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরে নিরাপত্তার জন্য রয়েছে আলাদা একটি বিভাগ। এর দায়িত্বে আছেন সেনা সদস্যরা। বন্দরে রয়েছে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। রয়েছে পর্যাপ্ত আনসার সদস্য। নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করার জন্য বন্দরের ভেতর রয়েছে ওয়াচ টাওয়ার। বন্দরের মতো একটি স্পর্শকাতর জায়গায় ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমে পণ্য চুরির ঘটনা ‘দুঃখজনক’ বলে মন্তব্য করছেন তারা।
এদিকে গত ২১ ও ২২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শনে আসেন ইউএস কোস্টগার্ড আইএসপিএসের পাঁচ সদস্যের একটি দল। বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছিলেন তারা। কিন্তু সপ্তাহ না যেতেই বন্দরে ঘটে পণ্য চুরির ঘটনা।
এ বিষয়ে বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গায় চুরির ঘটনা অবশ্যই উদ্বেগজনক। এটা বিশেষ করে রপ্তানির জন্য হুমকি। এসব ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বিদেশি বায়াররা (ক্রেতা) যদি মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে আমাদের পাশাপাশি দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ খবরের কাগজকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর সম্প্রতি আধুনিক যন্ত্রপাতি, স্ক্যানার মেশিন বসানোসহ বিভিন্ন দিক দিয়ে উন্নতি করেছে। তবে সম্প্রতি বন্দরের ইয়ার্ড থেকে পণ্য চুরির ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এটা বন্দরের ভাবমূর্তিকে আন্তর্জাতিকভাবে নষ্ট করবে। বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের। সেদিকেই এখন বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিন্তা করতে হবে।’
তবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক লে. কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কিছু স্ক্র্যাপ পণ্য চুরি হয়েছে। এটার বাজার মূল্যও এত বেশি না। তবে এই চুরির সঙ্গে জড়িত তিনজনকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি। পাশাপাশি বন্দরের ভেতরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।’
বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি, শ্রমিক বেশে কেউ বা অন্য কোনোভাবে সংরক্ষিত এলাকার ভেতরে প্রবেশ করেছে। এই চুরির ঘটনায় বন্দরের কেউ জড়িত কি না সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাটি তদন্তের জন্য নিরাপত্তা বিভাগ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।’