ইন্টার্ন চিকিৎসকদের পাঁচ দফা দাবি আদায়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। ইন্টার্ন চিকিৎসক কাউন্সিলের আহ্বানে কর্মসূচির প্রথম দিন পালিত হয় গতকাল সোমবার। সকাল ৮টা থেকে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মসূচি শুরু করেন। দাবি আদায়ে তারা গতকাল কাজে যোগ দেননি। মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও ইন্টার্নদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেন। ইন্টার্নরা দাবি বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন বা স্বাস্থ্য প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দেন। তারা পরীক্ষাসহ সব অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দেন। ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি চলায় সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েন রোগী ও তাদের স্বজনরা। জরুরি বিভাগে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা সেবা দিলেও ওয়ার্ডে তারা সেবা দেননি।
আজ মঙ্গলবার ইন্টার্ন চিকিৎসকদের একটি দাবি নিয়ে হাইকোর্টের রায় দেওয়ার কথা রয়েছে। এই রায় সামনে রেখে উচ্চ আদালত অভিমুখে মার্চ ফর জাস্টিস কর্মসূচি নামে মার্চ টু কোর্ট করবেন মেডিকেল শিক্ষার্থী ও চিকিৎসকরা। সকাল ১০টায় শহিদ মিনার থেকে রওনা হবেন তারা। এই রায় কোন দিকে যায়, তার ওপর নির্ভর করছে আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ৯০তম বারের মতো হাইকোর্টের ওই রায় পিছিয়ে যায়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
গতকাল দেশের ১০টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালনের খবর পাওয়া গেছে। সেগুলো হলো চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
রাজশাহী: রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে কর্মবিরতি চলছে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের। হাসপাতালের ইন্টার্ন ডক্টর ফোরামের সভাপতি ডা. আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আমরা কর্মবিরতি চলমান রেখেছি। সোমবার আমরা কেউ কাজে যোগ দিইনি। সব ব্যাচের ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন অব্যাহত রয়েছে।’
কর্মবিরতির কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা। রামেক হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে দেখা যায়, ওয়ার্ডগুলোতে কোনো ইন্টার্ন চিকিৎসক নেই। ওয়ার্ডে দেখা পাওয়া যাচ্ছে না সিনিয়র চিকিৎসকদেরও। হাসপাতালে আসা রোগীর স্বজন নাসির উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘সকালে একবার শুধু ডাক্তারের দেখা পেয়েছি। কিন্তু সারা দিন আর ডাক্তারের দেখা পাইনি।’ পুঠিয়া থেকে আসা শিরিন আখতার বলেন, ‘জরুরি বিভাগ থেকে ওয়ার্ড, কোথাও ডাক্তার নেই। সকাল থেকে রোগী নিয়ে বসে আছি। বড় ডাক্তার এলে চিকিসা শুরু হবে।’ তবে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক এফ এম শামীম আহম্মদ জানান, ওয়ার্ডগুলোতে চিকিৎসার কোনো ব্যাঘাত ঘটছে না।
চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সমর্থন জানিয়েছেন। সকাল ৮টা থেকে কর্মসূচি পালন শুরু করেন তারা। ইন্টার্ন চিকিৎসক মোহাম্মদ সাকিব বলেন, ‘কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও আন্দোলন চলছে। সোমবার চমেকের শিক্ষার্থীরাও যোগ দিয়েছেন। ক্লাস বর্জন করে এ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন তারা।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা ক্লাসে আসেনি। তবে শিক্ষকরা সবাই ক্যাম্পাসে এসেছেন। ক্লাসে ছাত্র না থাকায় শিক্ষকরাও অলস সময় কাটিয়েছেন। ছাত্ররা না এলে কীভাবে ক্লাস চলবে।’
রংপুর: শাটডাউন কর্মসূচি পালন করেছেন রংপুর মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। গতকাল রংপুর মেডিকেলের সামনে বিক্ষোভ করেন তারা। বেলা ১১টায় কলেজের প্রধান ফটকে শুরু করে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুখতার ইলাহী চত্বর প্রদক্ষিণ করে আবারও প্রধান ফটকে এসে মিছিল শেষ করেন তারা।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডা. রায়হান আলী বলেন, ‘আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি যাতে বিফলে না যায় সেটা দেখার জন্য সরকারকে অনুরোধ করছি। তা না হলে আমরা কঠোর আন্দোলনে যাব।’ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, প্রাইম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, আর্মি মেডিকেল কলেজ, রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর কমিউনিটি ডেন্টাল কলেজসহ কয়েকটি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা কর্মসূচিতে যোগ দেন।
দিনাজপুর: গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. হাদিউজ্জামান সেতু ও সাধারণ সম্পাদক ডাক্তার জুবায়েদ আমিন জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেন। জেলা প্রশাসকের পক্ষে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নুরে এ আলম স্মারকলিপি গ্রহণ করেন।
কুমিল্লা: কর্মসূচির অংশ হিসেবে কুমিল্লার বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে স্মারকলিপি দিয়েছেন। গতকাল বেলা ১১টায় কুমিল্লার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. রেজা সরোয়ারের কাছে তারা এই স্মারকলিপি দেন।
সিলেট: ইন্টার্ন চিকিৎসকরা দুপুর ১২টায় সিলেট সিভিল সার্জন অফিসের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। পরে তারা সিভিল সার্জনের কাছে স্মারকলিপি পেশ করেন। স্মারকলিপি গ্রহণ করেন সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মনিসর চৌধুরী।
ফরিদপুর: গতকাল সকাল থেকে কর্মবিরতি শুরু হয় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ইন্টার্নরা বলেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। মেডিকেল শিক্ষার্থী আতিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের দাবি পূরণের কোনো পরিবেশ দেখছি না। কর্তৃপক্ষের এই উদাসীনতায় আমরা ক্ষুব্ধ।’
ময়মনসিংহ: গতকাল দুপুর ১২টায় মেডিকেল কলেজের সামনে জড়ো হন শিক্ষার্থীরা। পরে তারা কলেজ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু করেন। শিক্ষার্থীরা জানান, পাঁচ দফা আদায় না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ থাকবে। ৬১ ব্যাচের শিক্ষার্থী জিহাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা আজকে ‘অ্যাকাডেমিক শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করেছি। দাবি আদায় না হলে লাগাতার আন্দোলন চলবে।’
সিরাজগঞ্জ: সিরাজগঞ্জের শহিদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্নরা সকাল থেকে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ ও কর্মবিরতি কর্মসূচি শুরু করেন। এতে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা ভোগান্তিতে পড়েন। ইন্টার্ন চিকিৎসকরা বলেন, ‘যতক্ষণ না আমাদের দাবি মানা না হয়, ততক্ষণ আমাদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।’
মাগুরা: মাগুরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা গতকাল সকাল থেকে ক্লাস বর্জন শুরু করেন। পাশাপাশি তারা কর্মবিরতি চালিয়ে যান।