‘বসে পড়েন ভাই, আসেন ভাই, এখানে ভাই, ভাই বইস্যা পড়েন’- প্রথম রোজার ইফতার করতে রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের এক নম্বর গেট দিয়ে ঢুকতেই এমন বহু অনুরোধ-আহ্বান পেতে থাকলেন ইস্কান্দার হোসেন। কারণ তিনি মসজিদ অঙ্গনে প্রবেশ করতে করতেই মাগরিবের নামাজের আজান শুরু হয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে সারি সারি মানুষ মুখে তুললেন এবারের রোজার প্রথম ইফতার।
তখন যারা মসজিদে ঢুকছিলেন, তারাই এদিক-ওদিক থেকে আহ্বান-অনুরোধ পাচ্ছিলেন, ইফতারে শরিক হওয়ার জন্য। যে শহরে শিশু বয়স থেকেই শিখে রাখতে হয়- ‘অপরিচিত লোকের দেওয়া কিছু খাবেন না’, সেই শহরের মানুষরা কী অবলীলায় অপরিচিতের সঙ্গে এক ডিশে (খাবারের বড় থালা) চারজন/ছয়জন ইফতার করছেন। আবার ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে আসা ১২-১৫ টুকরোর এক পোঁটলা আনারস বা তরমুজ আশপাশের ডিশেও কয়েক টুকরো করে বিতরণ করে খাচ্ছেন কেউ কেউ। অন্যের থালায় বিনা অনুমতিতে খাবার দেয়ার শহুরে ‘ম্যানার’ এখানে অপ্রাসঙ্গিক। ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে আসা কয়েকটি খেজুর কতজনকে বিলিয়ে খাওয়া গেল, তাতেই শোকর করেন এখানে আগতরা।
রোজার প্রথম দিনে ইফতারের আগে বায়তুল মোকাররমে গিয়ে জানা যায়, এখানে রোজ কমবেশি সাড়ে ৫ হাজার মানুষ একসঙ্গে মুখে ইফতার তোলেন। তবে এত মানুষের আয়োজন এককভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা করে না।
এর মধ্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আয়োজনে দৈনিক দুই হাজার মানুষের ইফতারের আয়োজন করা হয় বলে খবরের কাগজকে জানিয়েছেন বায়তুল মোকাররমের মুয়াজ্জিন কারি মো. হাবিবুর রহমান। ‘বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ মুসল্লি কমিটি’-এর সভাপতি আবদুল গাফফার জানিয়েছেন, তাদের সংগঠন থেকেও রোজ দুই হাজার মানুষের ইফতারের আয়োজন করা হয়। আরেক সংগঠন ‘বাংলাদেশ মুসল্লি সমাজ’-এর নেতৃত্বে থাকা শায়েখ ফজলুল হক জানিয়েছেন, তারা রোজ এক হাজার মানুষের ইফতারের আয়োজন করেন। ২৮ বছর ধরে প্রতি রমজানে তাদের সংগঠন ইফতারের আয়োজন করে আসছে। সাধারণ মানুষের আর্থিক সমর্থনে এই আয়োজন করে তারা।
ইফতারের তখনো পনেরো মিনিটের মতো বাকি। আয়োজন অনুসারে উপস্থিতি অনেক কম। বিষয়টিতে মনোযোগ আকর্ষণ করলে ফজলুল হক বলেন, ‘ইফতারের ঠিক দুই-তিন মিনিট আগে একসঙ্গে অনেক মুসল্লি ঢুকবেন। তা ছাড়া আজ (রবিবার) প্রথম দিনের ইফতারে লোক তুলনামূলক একটু কমই হবে। কারণ অনেকে আগে থেকেই ঠিক করে রাখেন যে, প্রথম দিনের ইফতার মা, বাবা, বিবি-বাচ্চার সঙ্গে একসঙ্গে করবেন। তাই বাসায় চলে গেছেন।’
এখানকার আয়োজনে সব সংগঠনের ইফতারের মেনু একই- এমন নয়। অতি সাদামাটা ইফতারও আছে কোনো কোনো সংগঠনের আয়োজনে।
গত দেড় দশক ধরে প্রায় প্রতি রমজানেই বায়তুল মোকাররমে দুই-একদিন করে ইফতার করেন ব্যাংকার জায়েদুল ইসলাম। অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘আমার প্লেটটিও মোটেও রিচ (সমৃদ্ধ) ছিল না। কিন্তু সেরকম ইফতার করতে চাইলে তো আমি কোনো একটা রেস্টুরেন্টে গেলেই পারতাম। কিন্তু আরও এক বছর বেঁচে থাকলে হয়তো এখানে আবার একসঙ্গে ৫ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজার মানুষের সঙ্গে ইফতার করার নেক নসিব হবে। না বাঁচলে হবে না। এটা ভাবলে আর প্লেটে কী আছে, সেটা মনে আসে না।’ইশারায় উপস্থিত লোকজনকে দেখিয়ে বললেন, এখানে যেমন ভবঘুরেরা ইফতার করতে আসেন, আবার অনেক টাকাপয়সাওয়ালারাও আসেন, তাদের সবার পরিচয় তারা মানুষ, অন্তত এখানে ইফতার করতে এসে কেউ ধনী-গরিবের ব্যবধানটা মাথায় রাখেন না।’
ইফতারের তখনো আধা ঘণ্টার মতো বাকি। বোতলে বোতলে শরবত ঢেলে প্রস্তুত করছিলেন মোহাম্মদ আলী। বললেন এই আয়োজনটি তাবলিগ জামাতের (জুবায়েরপন্থি)। তারা রোজ ৪৫০ থেকে ৫০০ মানুষের ইফতারের আয়োজন করেন। তারা সবাই সাধারণ মানুষ। তাবলিগ জামাতের প্রথা প্রতি ডিশে কয়েকজন করে খাবার খান তারা। এখানে প্রতি ডিশে ৬ জন করে ইফতার করেন। প্রথম দিন তারা ৭০টি ডিশ সাজান। এ ছাড়া ‘আল্লার দান’ নামে একটি সংগঠনও রোজ ১৫০ জন মানুষের জন্য ইফতারের আয়োজন করে বলে জানা গেছে।