রাজধানীতে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি এখন দৈনন্দিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকালে এই প্রতিষ্ঠান তো বিকেলে অন্য সংস্থা উন্নয়নের নামে কাটছে সড়ক। কর্তৃপক্ষের সমন্বয়হীনতার কারণে একটি সড়ক বছরে দুই থেকে তিনবারও খোঁড়াখুড়ি হচ্ছে। কখনো পানি নিষ্কাশনের পাইপ বসানোর জন্য, কখনো বা বিদ্যুতের লাইনের কাজ, সিটি করপোরেশনের সড়ক মেরামতের জন্য কাটা হচ্ছে সড়ক। আর উন্নয়নের নামে এসব খোঁড়াখুঁড়ি নগরবাসীর বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বছরজুড়ে এমন দুর্ভোগ লেগেই থাকে। ঢাকায় ঘন বসতিপূর্ণ এলাকার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মোহাম্মদপুর। এ এলাকায় রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২ ও ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড। ওয়ার্ডের সড়কগুলোর করুণ দশা। গতকাল রবিবার সরেজমিন দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। কোথাও ঢাকা ওয়াসার, কোথাও ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) কাজ চলছে। সিটি করপোরেশনের সড়ক মেরামতের কাজও চলছে। খোঁড়া সড়কেই রাখা হয়েছে মাটি, ইটের স্তূপ, বালি, পাইপ, মাটি খোঁড়া ও সড়ক নির্মাণসামগ্রী।
সড়ক কাটাকাটি-খোঁড়াখুঁড়িতে যান চলাচল দূরে থাক, হাঁটাই দায়! ভাঙা সড়কের ধুলো-বালির আস্তর পড়ে গেছে আশপাশের বাড়িগুলোতে। এলাকায় বায়ুদূষণের মাত্রাও অনেক বেড়ে গেছে। একাধিক রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে সচল সড়কগুলোতে যান চলাচল বেড়েছে, এর ফলে মোহাম্মপুরে যানজট লেগেই থাকে। নিতান্ত বাধ্য হয়েই প্রতিদিন এসব পথে আসা-যাওয়া করছেন কর্মজীবী, শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। সড়কের কাজ করা শ্রমিকরা জানান, রাস্তা সংস্কার করতে আরও দুই থেকে তিন মাস লাগতে পারে।
এ ছাড়া মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন প্রধান সড়কে বড় বড় ভাঙা-গর্তও চোখে পড়ার মতো। রাজধানীতে সড়কের জন্য এত কর্তৃপক্ষ থাকার পরও রাস্তাগুলো পরিপূর্ণ রূপ দেওয়ার মতো যেন কেউ নেই- এমনটিই অভিযোগ স্থানীয়দের।
মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের পাশে গুরুত্বপূর্ণ নূরজাহান রোড, তাজমহল রোড এবং রাজিয়া সুলতানা রোড। তিনটি সড়কের অবস্থাই বেহাল। সাধারণ মানুষ মুখে মাস্ক পরে হাঁটাচলা করতে পারলেও গাড়ি চলাচলের সুযোগ নেই। সাধারণ মানুষ রিকশা ও ভ্যান দিয়ে কায়দা করে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনা-নেওয়া করেন। রাস্তাগুলো ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় পড়ে আছে এক বছরের বেশি সময় ধরে। ড্রেনেজ লাইনের কাজ চলায় এসব সড়কের যত্রতত্র পড়ে রয়েছে বালুর স্তূপ, পাইপ। সড়কগুলোতে বড় বড় গর্ত। বাসিন্দাদের ভোগান্তির শেষই হচ্ছে না।
এই সড়কগুলোর সঙ্গে আশপাশের বিভিন্ন গলির রাস্তা সংযুক্ত রয়েছে। প্রতিটি গলির অবস্থাও নাজুক। প্রতিটি গলির রাস্তায় কিছু দূর পরপর চিকন পাইপলাইন বসানো হচ্ছে। খোঁড়া হয়েছে সড়ক। লাইনের কাজ শেষ হলেও রাস্তাগুলো সঠিকভাবে মেরামত হচ্ছে না। ফলে যান চলাচলে তৈরি হচ্ছে ভোগান্তি। তাজমহল রোডের সি-ব্লকে গিয়ে দেখা যায় গাড়ি চলাচলেরও অবস্থা নেই। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এতগুলো সড়কে একসঙ্গে কাটাকাটি ও খোঁড়াখুঁড়ির কারণে বাসিন্দাদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
উন্নয়নের নামে দীর্ঘ সময় ধরে এই খোঁড়াখুঁড়ি এবং কাজের ধীরগতি নিয়ে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা। হাতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে হেঁটে টাউন হল থেকে ফিরছিলেন এবং নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন নূরজাহান রোডের বাসিন্দা সেলিম খান। ষাটোর্ধ্ব এই ব্যক্তি বলেন, ‘কয়েক মাস ধরে এই সড়কটি কেটে ড্রেনেজ লাইন বসানো হচ্ছে। তাদের কাজই শেষ হচ্ছে না। ভোগান্তিতে তো আমরা, ইঞ্জিনিয়ারদের কাজ কী? তারা তো আর আমাদের কষ্ট বুঝবে না। যত বেশি প্রজেক্ট, তাদের তত বেশি টাকা পকেটে ঢুকবে। ভালো রাস্তা খুঁড়ে ফেললে তাদের পকেটে টাকা ঢোকে। তারা মানুষের কী বুঝবে?’
রাজিয়া সুলতানা রোডের বাসিন্দারা জানালেন, কিছুদিন আগেই পাঁচ-ছয় মাস ধরে রাস্তা খুঁড়ে গ্যাসের কাজ করা হলো। এখন আবার চলছে পানির লাইন মেরামতের কাজ। কাজে এমন দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বয়হীনতা তাদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।
মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের অবস্থাও একই। সড়কটিতে ওয়াসার কাজ চলছে ধীরগতিতে। রাস্তা খুঁড়ে পানির লাইনের কাজ চলছে। কিছু কাজ হলেও সড়কটির একাধিক স্থানে এখনো কাজ শেষ করা হয়নি। আদাবর ১৬ নম্বর সড়কটিতেও দীর্ঘদিন ধরে চলছে ড্রেনেজ বসানোর কাজ। ওই এলাকার মানুষের চলাচলে ভোগান্তিও চরমে।
মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদসংলগ্ন মোহাম্মদী হাউজিং সোসাইটির পাঁচটি সড়কে এক বছরের বেশি সময় ধরে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলছে। যে রাস্তাগুলো ব্যবহার করে বেড়িবাঁধে ওঠা যেত, সেখানে রাস্তা কেটে ফেলে রাখা হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। এর পাশে চাঁদ মিয়া হাউজিংয়ের সড়কের অবস্থা বেহাল হয়ে আছে।
মোহাম্মদপুর প্রধান সড়ক আসাদগেট থেকে টাউন হল পর্যন্ত যানজটের প্রধান কারণ রাস্তার পাশের ফুটপাত। সড়কটি খোঁড়াখুঁড়ির পর ঠিক হলেও ফুটপাতের কাজ শেষ হয়নি। এর ফলে বায়ুদূষণ সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি যানজট লেগেই থাকে।
সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির ফলে মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের অধিকাংশ গলি, তাজমহল রোড, হুমায়ুন রোড, টিক্কাপাড়া, মোহাম্মদী হাউজিং সোসাইটি, শেখেরটেক, আদাবর, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের আশাপাশে, শেরশাহ সুরি রোডসহ একাধিক এলাকার বাসিন্দারা দীর্ঘদিন দুর্ভোগে রয়েছেন।
মোহাম্মদপুর এলাকাটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন অঞ্চল-৫-এর অধীনে অন্তর্ভুক্ত। এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার (উপসচিব) দায়িত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। দীর্ঘদিন সড়কগুলোর অবস্থা বেহাল হলেও এর নির্দিষ্ট কারণ জানেন না সাইফুল। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘সড়কগুলো কেন দীর্ঘদিন এমন অবস্থা হয়ে আছে, তা আমি খোঁজখবর নিয়ে পরে জানাব।’