যাদের জীবিকা সড়কে, সেই সব দিনমজুরকে ইফতারও সারতে হয় সড়কেই। এমন একজন সিরাজগঞ্জের সলঙ্গার বাসিন্দা আব্দুল হামিদ। রাজধানীতে ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রিকশা চালান তিনি। প্রতিবছর রমজান এলেই নিয়ম করে ইফতার করতে হয় সড়কে, এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি।
শুক্রবার (২১ মার্চ) রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে কথা হয় হামিদের সঙ্গে। হামিদ পরিবার ছাড়া রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে রিকশার গ্যারেজে থাকেন। সাহরি গ্যারেজে করতে পারলেও ইফতার সারতে হয় সড়কেই। খবরের কাগজকে আব্দুল হামিদ বলেন, ‘রোজা এলেই আমাদের চাপ বেড়ে যায়। রোজা রেখে রিকশা চালালে পানির পিপাসা বেশি লাগে। অনেক রিকশাচালক আছেন, যারা পানির পিপাসার কষ্টের কারণে রোজা রাখেন না। আমি শুরু থেকেই রোজা থাকি। বাড়ির থেকে খোঁজ নেন, রোজা রাখি কি না।’
প্রতিদিন ইফতারে ৬০ থেকে ১০০ টাকা খরচ হয় উল্লেখ করে রিকশাচালক হামিদ বলেন, ‘বেশির ভাগ সময়ই রাস্তায় ইফতার করতে হয়। এ ছাড়া মাঝেমধ্যে গ্যারেজে করি। তবে গ্যারেজে ১০-১৫ জন করি, সেখানে ইফতার করলে টাকাও কম লাগে, ৩০ টাকার মধ্যেই হয়ে যায়। এমনিতে রাস্তায় করলে ৬০ থেকে ১০০ টাকা লাগে। ছোলা, বুন্দিয়া, পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, মুড়ি এগুলো খাওয়া হয়।’
হামিদ গতকাল ইফতার না কিনলেও আরেক রিকশাচালক মোসলেম উদ্দিনের কেনা ইফতার ভাগ করে খাচ্ছেন। অথচ ইফতারের মিনিট ১০ আগেও একে অন্যকে চিনতেন না তারা। ইফতারের এমন দৃশ্য দেখলে মনে হবে তারা অনেক আগের পরিচিত। মোসলেমের বাড়ি ভোলার ভেদুরিয়াতে। ঢাকাতে বাবা, মা, স্ত্রী, সন্তান নিয়ে থাকেন তিনি। খবরের কাগজকে মোসলেম উদ্দিন বলেন, ‘বাসায় বাবা, মা, স্ত্রী-বাচ্চারা আছেন। সবাই মিলে অনেক জমজমাট ইফতার হয়। এবারের রমজানে সপ্তাহখানেক বাসায় ইফতার করেছি। বাকি দিনগুলো রাস্তায় করতে হচ্ছে।’
রাস্তায় ইফতার করতে গেলে খাবার কিনতেই হিমশিম খেতে হয় উল্লেখ করে এই রিকশাচালক বলেন, ‘ইফতার করতে অন্তত ১০০ টাকা তো লাগেই। সারা দিন যে পরিশ্রম করি, রোজা থেকে এতে ১০০ টাকায় ইফতারি তো হয় না, এটা ফুটপাতের খানা। দুটি আলুর চপ, বুট, মুড়ি কিনতেই ১০০ টাকা শেষ।’
পলিথিনে রাখা খাবারের দিকে আঙুল দেখিয়ে হাসতে হাসতে মোসলেম উদ্দিন বলেন, ‘দেখেন, বুন্দিয়া-জিলাপি-চিকেন, হালিম ও ফলমূল নাই, যেটা বড়লোকেরা খান। সেগুলো আমাদের কেনার সামর্থ্য নাই। আমি মনে করি, দিনমজুর-রিকশাচালক এবং কৃষিকাজ যারা করেন, তারা খুব অশান্তিতে আছেন। অনেক রিকশাচালক পানি খেয়ে ইফতারি করেন। ইফতারি কিনতেই ১০০-১৫০ টাকা লাগে, এখন একজন রিকশাচালক ইফতারি কিনবেন নাকি পরিবার দেখবেন।’
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়াতে এখন আয় কম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখন তো স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি বন্ধ, তা-ই ইনকামও কম। ঈদ কাছে আসাতে অনেকেই ঢাকা ছেড়ে বাড়ি গেছেন, যার কারণে লোকজন কম। তবে দুপুর থেকে ইফতারের আগ মুহূর্তে কিছুটা যাত্রী থাকেন।’
কথা শেষের একপর্যায়ে মোসলেম বলেন, ‘দেখেন, বড়লোকের ৫০০ টাকার শার্ট হাজার টাকায় কেনেন আর রিকশাচালকরা যদি ৩০ টাকার ভাড়া ৫০ টাকা চান, তাহলে শুরু হয় বকাঝকা, অনেক সময় চড়-থাপ্পড়ও দেন।’
রিকশাচালক হামিদ-মোসলেমের রোজা-ইফতার নিয়ে অনেক সংগ্রামের গল্প থাকলেও অনেক রিকশাচালকই রিকশা চালানোর কারণেই রোজা রাখেননি। পরিবারের মুখে খাবার ও ঈদের হাসি ফোটাতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যাত্রীকে একস্থান থেকে অন্যস্থানে পৌঁছে দিচ্ছেন তারা। হয়তো এটিই তাদের নিয়তি, এভাবেই হয়তো যাত্রী আনা-নেওয়াতে শেষ হয়ে যাবে হামিদ-মোসলেমদের গল্প।