নানা কারণে বাংলাদেশে গত দুই বছরের ব্যবধানে দারিদ্র্য ও হতদারিদ্র্যের হার বেড়েছে। এর সঙ্গে বিবিএসের জরিপের তুলনা করা হলে ভুল হবে বলে বিআইডিএসের প্রতিবেদেন উল্লেখ করা হয়েছে।
সোমবার (২৪ মার্চ) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সেমিনারে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ, সেটি ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৪৩ শতাংশে। একই সঙ্গে অতিদারিদ্র্যের হার ৬ দশমিক ০৬ শতাংশ থেকে ২ বছর পর বেড়ে ৬ দশমিক ৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। শহরের মতো গ্রামেও দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। দুই বছরের ব্যবধানে দেশে দারিদ্র্যের হার এবং খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) পার্সেপশন সার্ভের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হকের সভাপতিত্বে সেমিনারে সার্ভের প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন বিআইডিসের গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইউনূস। এই সার্ভে ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের সহায়তায় এবং বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেনের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনা করেছেন ড. মোহাম্মদ ইউনূস। সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম বাংলাদেশের অফিসার ইনচার্জ সিসেমানি পারসেসমেন্ট।
সার্ভে প্রসঙ্গে ড. মোহাসম্মদ ইউনূস বলেন, ‘পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেনডিচার সার্ভের সঙ্গে বিআইডিএসের এই পার্সেপশন সার্ভের তুলনা হবে না। তবে বর্তমানে মানুষের অবস্থা যে খারাপ, সেটি জরিপে দেখা যাচ্ছে। বাস্তবতার সঙ্গে এর মিল রয়েছে। ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ, সেটি বেড়ে ২০২৪ সালের জরিপে ২৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ পাওয়া গেছে। সেই সঙ্গে অতিদারিদ্র্যের হারও ৬ দশমিক ০৬ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে গ্রামে দরিদ্র মানুষের হার ২০২২ সালের ২২ দশমিক ৫৬ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৪ দশমিক ১০ শতাংশ, একইভাবে অতিদরিদ্র মানুষের হার ৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এদিকে শহরে দরিদ্র মানুষের হার ২৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এ ছাড়া অতিদরিদ্র্যের হার ৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকায় দারিদ্র্যর হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সাল হয়েছে ২৩ দশমিক ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া অতিদারিদ্র্যের হার একই অর্থাৎ ৮ দশমিক ৮০ শতাংশই রয়েছে। খুলনায় দারিদ্র্যের হার ২২ দশমিক ৩৩ শতাংশ থেকে ২৬ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং অতিদারিদ্র্যের হার ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। রংপুরে দারিদ্র্যের হার ২৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং অতিদারিদ্র্যের হার ২ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এ ছাড়া সিলেটে দারিদ্র্যের হার ২৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং অতিদারিদ্র্যের হার ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। পরিবারগুলোর মধ্যে ২০২২ সালে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগত ৩৮ দশমিক ০৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
ড. এ কে এনামুল হক বলেন, ‘২০২২ সালে করা বিবিএসের সার্ভের তথ্যের সঙ্গে এই পার্সেপশন সার্ভের তুলনা না হলেও বর্তমান অবস্থা বোঝার জন্যে বিআইডিএসের এই সার্ভেটি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের নীতি নির্ধারণে এসব তথ্য ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাওয়ার অনেক কারণ থাকতে পারে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি হয়েছে, দেশে বন্যা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং রাজনৈতিক কারণেও দারিদ্র্যের হার বেড়েছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিসেমানি পারসেসমেন্ট বলেন, ‘এটি বিবিএসের সঙ্গে তুলনা না চললেও বর্তমান পরিস্থিতি বোঝাতে বেশ কাজে দেবে। এর ফলে সরকারের নীতি নির্ধারণের কাজগুলো অনেক বেশি সঠিক হবে। পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম সচিব ড. দীপঙ্কর বলেন, ‘বিআইডিএসের সার্ভের সঙ্গে বিবিএস’র জরিপের তুলনা করা যাবে না। এটা তুলনা করলে ভুল হবে।’