ঈদের ছুটি ফুরিয়ে এসেছে; রাজধানীতে ফিরে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তাই ঢাকার সায়েদাবাদ, ফুলবাড়িয়া ও মহাখালী আন্তজেলা বাস টার্মিনাল এলাকায় পরিবহন শ্রমিকদের তৎপরতা বেড়েছে। কমলাপুরে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনেও গতকাল শুক্রবার ঢাকায় ফিরে আসা যাত্রীদের বেশ চাপ দেখা গেছে।
শুক্রবার (৪ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মহাখালী আন্তজেলা বাস টার্মিনাল এলাকায় কথা হয় ইফতেখার হোসেনের সঙ্গে। একতা পরিবহনের বাসে তিনি ফিরেছেন নওগাঁ থেকে। তিনি বলেন, ‘আজ আমার ছুটির শেষ দিন ছিল। ভাবছিলাম, রাতের দিকে ফিরব। কিন্তু মহাসড়কে ডাকাতির ভয়ে পরিবার নিয়ে সকালের বাসেই রওনা হয়েছি। এতে একদিকে যেমন নিরাপত্তা নিয়ে টেনশন করতে হয়নি, অন্যদিকে যানজটের ঝক্কি-ঝামেলা ছাড়া সহজে ঢাকায় আসতে পেরেছি।’
ময়মনসিংহ থেকে ইউনাইটেড পরিবহনের বাসে ঢাকায় ফিরেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আশীষ তালুকদার। তিনি বলেন, ‘যাত্রাপথে ভোগড়া বাইপাস থেকে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত বিআরটি লেনে ভোগান্তি হয়েছে। তবে এই জ্যাম খুব যে বড় আকার ধারণ করেছিল তা নয়। মোটামুটি নির্বিঘ্নে আমরা ঢাকা ফিরতে পেরেছি।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা যাত্রী রেহানা আক্তার বলেন, ‘শনিবার থেকেই আমার অফিস। তাই আজকে ফিরতেই হতো। বাড়ি গিয়েছিলাম ট্রেনে। কিন্তু ফিরতি যাত্রার টিকিট পাইনি বলে বাসে আসতে হয়েছে। মহাসড়কে নির্মাণকাজ চলছে। এতে একটু ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। টঙ্গী-ঘোড়াশাল আঞ্চলিক সড়ক মোটামুটি ফাঁকা ছিল।’
মহাখালী আন্তজেলা বাস টার্মিনাল এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মনির বলেন, ‘কয়েক দিনে বাস টার্মিনালগুলোতে যাত্রীর সংখ্যা ছিল অনেক কম। তেমন ট্রিপ পাইনি। আজকে সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মতিঝিল, নারিন্দা আর সেগুনবাগিচায় গেলাম। রাস্তা ফাঁকা বলে যেতে আসতে তেমন সময় লাগেনি।’
মহাখালী আন্তজেলা বাস টার্মিনাল বাস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম বলেন, ‘শনিবার বিকেলে টার্মিনাল এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে যাবে। যারা ঢাকার বাইরে গেছেন ঈদের ছুটি কাটাতে, তারা ফিরে আসবেন। রবিবার সকালেও কিছুটা ভিড় হবে। এমন স্বস্তির ঈদযাত্রা সচরাচর দেখা যায় না। বলা যায় এবার ঈদযাত্রাই সেরা।’
গুলিস্তানে ফুলবাড়িয়া আন্তজেলা বাস টার্মিনালেও গতকাল সকালে ঢাকায় ফিরে আসা যাত্রীর বেশ ভিড় দেখা গেছে। ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে ছেড়ে আসা বাসগুলো শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার পরে টার্মিনালে আসে। সাধারণত ফুলবাড়িয়াতে খুব কম যাত্রীই নামেন। তারা জুরাইন, যাত্রাবাড়ী, গোলাপশাহ মাজার কিংবা গুলিস্তান-ফ্লাইওভার এলাকায় নেমে যান। গোলাপশাহ মাজার এলাকায় নেমেছিলেন আজিমপুরের বাসিন্দা রাজিব হালদার। তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে ভারী মালপত্র ছিল। তাই আমাকে গুলিস্তান পর্যন্ত আসতে হয়েছে। এখান থেকে রিকশায় খুব বেশি দূরে না আমার বাসা।’
ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালের বাস মালিক সমিতির নেতা কাজী জুবায়ের মাসুদ বলেন, ‘এবারের ঈদযাত্রা নিয়ে যাত্রীদের খুব কম অভিযোগ পেয়েছি। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর থাকায় সড়ক, মহাসড়কে বড় দুর্ভোগ পোহাতে হয়নি যাত্রীদের।’
শুক্রবার সকালে রাজধানীর কমলাপুরে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনেও যাত্রীদের বেশ ভিড় লক্ষ করা গেছে। একতা এক্সপ্রেসে দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে এসেছেন রমিজ হাসান। তিনি বলেন, ‘ট্রেন পার্বতীপুরে একদম ঠিক সময়ে এসেছে। আর ঢাকায়ও যথাসময়ে পৌঁছে গেছি। আমি ভাবতেই পারছি না যে, কোনো বিলম্ব ছাড়াই আমি ঢাকা আসতে পেরেছি। তবে এদিন ঢাকা থেকে লালমনিরহাটগামী আন্তনগর বুড়িমারী এক্সপ্রেস (৮০৯) এবং রংপুরগামী রংপুর এক্সপ্রেস (৭৭১) ট্রেনের যাত্রা বিলম্বিত হয়েছে।’
রেলের শিডিউল অনুযায়ী, বুড়িমারী এক্সপ্রেস (৮০৯) ঢাকা থেকে নিয়মিত সকাল সাড়ে ৮টায় লালমনিরহাটের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। অন্যদিকে রংপুর এক্সপ্রেস নিয়মিত সকাল ৯টায় ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন থেকে রংপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।
ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মো. আনোয়ার হোসেন খবরের কাগজকে জানান, বুড়িমারী এক্সপ্রেস আড়াই ঘণ্টা আর রংপুর এক্সপ্রেস ১ ঘণ্টা দেরিতে স্টেশন ছেড়ে গেছে।
এ দুটি ট্রেন দেরিতে ছাড়ায় উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীরা বিপাকে পড়েন। পরিবার-পরিজন নিয়ে বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে যাওয়া যাত্রীরা বারবার স্টেশন ম্যানেজার ও স্টেশন মাস্টারের কক্ষে গেলেও তাদের দেখা পাচ্ছিলেন না। ভ্যাপসা গরমে অনেক শিশু ও বয়োবৃদ্ধ যাত্রী অস্বস্তিতে পড়েন।
এদিকে বিআরটিএ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, গত ৩ এপ্রিল সারা দেশে বিআরটিএ মোবাইল কোর্টের বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। এই অভিযানে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, অতিরিক্ত গতি, রুট ভায়োলেন্স, ওভারলোড ও হাইড্রোলিক হর্ন, হেলমেট ব্যতিত মোটরসাইকেল চালনা, মোটরসাইকেলে একের অধিক যাত্রী বহনসহ ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’-এর অন্যান্য ধারা অমান্যের কারণে ৩২৬টি মামলা করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত চালকদের ৬ লাখ ৯৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন।
বরিশাল থেকে ফিরতে ভোগান্তি:
পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ছুটছেন দক্ষিণাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ। এ কারণে লঞ্চ ও বাসে যাত্রীর চাপ বেড়েছে কয়েক গুণ। এদিকে লঞ্চে কেবিন নেই, ডেকেও বসার জায়গা নেই। অন্যদিকে বাস কাউন্টারগুলোতে টিকিট না পেয়ে সীমাহীন ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে কর্মস্থলমুখী মানুষকে। তাই বাধ্য হয়ে যে যেভাবে পারছেন, সে সেভাবে কর্মস্থলে ছুটছেন। এর মধ্যে কেউ লঞ্চের ছাদে ও বাসে দাঁড়িয়ে আবার কেউ ট্রাক ও মাইক্রোবাসযোগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছেন।
এদিকে মানুষের দুর্ভোগকে কাজে কয়েকটি লঞ্চের ও বাসের টিকিট কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে কাউন্টারে টিকিট না পেলেও দালালদের কাছ থেকে বেশি দামে টিকিট কিনেছেন অনেক যাত্রী। অন্যদিকে লঞ্চের ডেকে বিছানার চাদর ও বালিশ, তোশক বিছিয়ে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে লঞ্চ কর্মচারীদের বিরুদ্ধে।
সরেজমিনে বাস টার্মিনাল ও লঞ্চঘাট এলাকায় দেখা যায়, বরিশাল লঞ্চ টার্মিনালে দুপুর গড়াতে না গড়াতেই ঢাকাগামী লঞ্চের ডেক যাত্রীতে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। এ ছাড়া লঞ্চের ছাদ ও কেবিনের করিডরও যাত্রীতে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। সেখানে তারা বিছানা বিছিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।
এদিকে এমভি পারাবত কোম্পানির চারটি ও এমভি মানামী, এমভি কীর্তনখোলা, এমভি কুয়াকাটা-২ লঞ্চের প্রথম তলার অর্ধেক এবং দ্বিতীয় তলার পুরো জায়গা বিছানা বিছিয়ে দখল করে রাখতে দেখা গেছে, যা পরবর্তী সময়ে যাত্রীদের কাছে চড়া মূল্যে বিক্রি করা হয় বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে মানামী লঞ্চের যাত্রী মো. আহসান উল্লাহ বলেন, ‘দুপুরে লঞ্চঘাটে এসে দেখি লঞ্চের ডেকে সারিবদ্ধভাবে বিছানা চাদর পাতানো। পরে লঞ্চের এক শ্রমিকের কাছ থেকে দুজনের জন্য ছয় ফুট জায়গা ৪০০ টাকায় কিনতে হয়েছে।’
কীর্তনখেলা লঞ্চের যাত্রী মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দুপুরের দিকে এসে দেখি লঞ্চের ডেকে পা ফেলানোর জায়গা নেই। নিরুপায় হয়ে ছাদে বিছানা বিছিয়ে জায়গা করে নিয়েছি।’
পারাবত লঞ্চের যাত্রী মিন্টু সরদার বলেন, ‘লঞ্চের ফ্যানের নিচের জায়গা লঞ্চ স্টাফরা চাদর বিছিয়ে দখল করে রাখেন। তাদের কাছ থেকে ৩০০ টাকা দিয়ে জায়গা কিনে নিয়েছি।’
সুন্দরবন-১০ লঞ্চের যাত্রী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘কেবিন না পেয়ে দুপুরে ঘাটে এসে দেখি লঞ্চের ডেকও প্রায় পূর্ণ হয়ে গেছে। অনেক কষ্টে সিঁড়ির নিচে একটু জায়গা পেয়েছি।’
পারাবত লঞ্চের বরিশালের ব্যবস্থাপক মো. সেলিম হোসেন বলেন, ‘যাত্রীরা সকালে লঞ্চে এসে বিছানা, চাদর ও তোশক বিছিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। এখানে আমাদের স্টাফদের কোনো হাত নেই। তারপরও এ কাজের সঙ্গে কেউ যুক্ত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সুন্দরবন লঞ্চের বরিশাল কাউন্টারের ব্যবস্থাপক মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালুর পরে লঞ্চের তেমন একটা যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। ঈদের পর থেকে যাত্রীদের তেমন একটা চাপ নেই। তবে আজ (শুক্রবার) ও আগামীকালের (শনিবার) কেবিনের টিকেট আগাম বিক্রি হয়ে গেছে।’
বরিশালের যাত্রীবাহী লঞ্চ মালিক সমিতির সদস্য সাইফুর ইসলাম পিন্টু বলেন, ‘২০২২ সালের ২৫ জুন থেকে লঞ্চযাত্রী তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। আগামী রবিবার (আগামীকাল) সরকারি ও বেশির ভাগ বেসরকারি অফিস খুলবে। এ কারণে শুক্রবার সব পরিবহন সেক্টরে যাত্রীদের চাপ বেড়েছে। আগামীকাল (শনিবার) এই চাপ আরও বাড়বে।’
বরিশাল নদীবন্দর কর্মকর্তা সেলিম রেজা বলেন, ‘যাত্রীদের সার্বিক নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য বিআইডব্লিউটিএ, নৌ-পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, মেট্রোপলিটন পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কাজ করে যাচ্ছেন। এর পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতও কাজ করে যাচ্ছেন। আগামীকাল (শনিবার) যাত্রী আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই ক্ষেত্রে বিশেষ সার্ভিসের লঞ্চ বাড়ানো হবে। যাত্রীদের কাছে ডেকের জায়গা বিক্রি করা হচ্ছে, আমরা এমন অভিযোগ পেয়েছি। এ বিষয়ে লঞ্চ কর্তৃপক্ষের সতর্ক করা হয়েছে।’
অন্যদিকে বরিশালের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের অবস্থাও ছিল একই। সকাল হতে না হতেই কাউন্টারের সব টিকিট বিক্রি হয়ে যায়।
এ বিষয়ে বাসযাত্রী মো. শাজাহান মিয়া বলেন, ‘স্বরূপকাঠির কাউন্টারগুলোতে আগামী শনিবারের টিকিট পাইনি। তাই সকাল ৬টায় বরিশাল বাস টার্মিনালে এসেছি। কিন্তু এখানেও টিকিট পাইনি। তবে দালালের কাছ থেকে টিকিট সংগ্রহ করেছি।’
সাব্বির হোসেন নামে এক যাত্রী বলেন, রবিবার অফিস খোলা। তাই আজ (গতকাল শুক্রবার) পরিবার নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার জন্য হানিফ পরিবহনের কাউন্টারে এসেছি। কিন্তু টিকিট পাইনি। তবে কালোবাজার থেকে চারটি টিকিট সংগ্রহ করেছি। প্রতিটি টিকিটের মূল্য ৫৩৪ টাকা লেখা রয়েছে। তবে এর বাইরে প্রতিটি টিকিটের জন্য ২০০ টাকা করে বেশি নিয়েছে।’
বরিশাল বাস মালিক গ্রুপের সদস্য (মালিক সমিতি) মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘বেশির ভাগ পরিবহনের অনলাইনে টিকিট বুকিং ব্যবস্থা রয়েছে। তাই আগামী ১২ মার্চ পর্যন্ত প্রায় সব বাসের টিকিট অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। এ কারণে বেশির ভাগ যাত্রী বাস কাউন্টার থেকে শূন্য হাতে ফিরছেন। ফলে তারা বাসে দাঁড়িয়ে, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন যানবাহনযোগে গন্তব্যে ছুটছেন।’
তিনি আরও বলেন, সরকার নির্ধারিত ভাড়া চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া না আদায় করার জন্য কাউন্টারগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তৎপর রয়েছেন। পাশাপাশি টিকিট কালোবাজারিদের ধরতে মালিক সমিতির সদস্যরাও কাজ করছেন।
এদিকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করায় গোল্ডেন লাইন পরিবহনের টিকিট কাউন্টারকে পাঁচ হাজার এবং লাবিবা ক্লাসিক পরিবহনের কাউন্টারকে পাঁচ হাজার, হানিফ পরিবহনের টিকিট কাউন্টারে তিন হাজার টাকা জরিমানা করেন জেলা প্রশাসন ও বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত।
সিফাত/