অন্তরর্বর্তী সরকার আসার পর থেকে বিভিন্ন দাবিতে রাজধানী ঢাকায় একের পর এক চলছে অবরোধ-বিক্ষোভ বা আন্দোলন। প্রতিদিনই ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো বেছে নিয়ে বিভিন্ন ব্যানারে এসব আন্দোলন-কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। যার প্রভাবে এসব এলাকার সড়কগুলোতে অনেক সময় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সড়কে যানবাহনের ধীর গতি বা আটকে থাকার কারণে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। একপর্যায়ে সেই যানজট গ্রাস করছে রাজধানীর অধিকাংশ এলাকা। এর ফলে মহাদুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন বিভিন্ন প্রয়োজনে রাজপথে চলা নগরবাসী। বাসা থেকে বেরিয়ে আকস্মিক এমন দুর্ভোগের শিকার হয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
বৃহস্পতিবারও (১৫ মে) রাজধানীর কাকরাইল এলাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবিতে অবরোধ-বিক্ষোভ হয়েছে। ঢাবিতে হল ছাত্রদলের নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র হিসেবে ইশরাক হোসেনকে বসানোর দাবিতে নগর ভবনের প্রধান ফটকসহ বিভিন্ন গেট অবরুদ্ধ করেন বিক্ষোভকারীরা।
বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ‘রিকশা, ব্যাটারি চালিত রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের’ ব্যানারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ হয়েছে। এ ছাড়াও প্রেসক্লাব এলাকায় রাখাইনের জন্য মানবিক করিডর নির্মাণ ও চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট।
বিভিন্ন শ্রেণি পেশার সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেছেন, বেশ কিছুদিন ধরেই ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চলছে অবরোধ-আন্দোলন। বিশেষ করে শাহবাগ ও প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা, সচিবালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ঘিরে প্রায় প্রতিদিনই দিনের কোনো না কোন সময় অবরোধ-বিক্ষোভ বা মানববন্ধন করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের নির্বিঘ্নে চলাচলের অধিকার প্রতিনিয়ত ক্ষুণ্ন করেই দাবি আদায়ে মাঠে নামছে বিভিন্ন পক্ষ। যদিও গতকাল আবারও কাকরাইল-সুপ্রিম কোর্ট এলাকাসহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সব ধরনের সভা, সমাবেশ, মিছিল, শোভাযাত্রা ও বিক্ষোভ প্রদর্শন নিষিদ্ধ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার দিনভর রাজধানীর বিজয় সরণি মোড় থেকে বাংলামোটর পর্যন্ত ছিল তীব্র যানজট। যানজটের সঙ্গে বৃষ্টিও বাড়তি ভোগান্তি যোগ করে। প্রতিটি সিগন্যালে যানবাহন আটকে থাকতে দেখা যায়। দুপুরে বিজয় সরণি থেকে ফার্মগেটমুখী সড়কে প্রায় ৩০ মিনিটেরও বেশি সময় যানবাহন চলতে দেখা যায়নি। তবে খামারবাড়ি হয়ে ফার্মগেট ও বাংলামোটর অভিমুখী সড়কে যান চলাচল করতে দেখা যায়।
বিজয় সরণি থেকে রিকশা নিয়ে আসছিলেন আব্দুর রহিম। আলাপকালে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই সড়কে দুপুর থেকে তেমন গাড়ি দেখছি না। হয়তো কোথাও অবরোধে যানবাহনগুলো আটকে আছে। রাস্তা ফাঁকা, তাই চালাচ্ছি (রিকশা)।’
এদিকে বিকেলে ফার্মগেট-বাংলামোটর রুটে যানবাহন চলাচলের গতি অতি মন্থর বা স্থবির ছিল। যানজটের কারণে তাই হেঁটে ফার্মগেট থেকে বাংলামোটর যাচ্ছিলেন সুমাইয়া আক্তার। চলতিপথে আলাপকালে সুমাইয়া বলেন, অফিস শেষ করে ইস্কাটনের বাসায় ফিরছিলেন তিনি। গাড়িতে উঠলেও জ্যামে বসে থাকতে হবে, তাই হেঁটেই বাসার উদ্দেশে রওনা দেন।
এদিকে গত বুধবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে, হেয়ার রোড, মিন্টো রোড ও বেইলি রোডের মন্ত্রীপাড়া এলাকায় পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে রাখে। এই কারণে বৃহস্পতিবার প্রায় দিনভর রাজধানীর কাকরাইল, সেগুনবাগিচা, রমনা, শাহবাগ, বাংলামোটর, মগবাজারসহ আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজট ছিল। মূল সড়ক ছাড়াও এই যানজটের প্রভাব পড়ে অভ্যন্তরীণ ছোট রাস্তা বা অলিগলিতেও। কয়টি রাস্তার মুখ চতুর্দিক থেকে আসা যানবাহনে জটলার সৃষ্টি হয়েছিল।
এদিকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনের সড়কেও পুলিশের ব্যারিকেড থাকায় শাহবাগ থেকে বাংলামোটর পর্যন্ত সড়কেও যানবাহনের প্রচণ্ড চাপ দেখা যায়। শিল্পকলা থেকে মৎস্যভবন হয়ে কাকরাইল মোড় পর্যন্ত সড়কেও যানবাহন অনেকটা আটকে ছিল। এসব যানবাহেনে থাকা চালক, যাত্রী-আরোহী সবাই চরম বিপাকে পড়েন।
সেগুনবাগিচা থেকে বাংলামোটরমুখী বাইক আরোহী ইরফান আলম বলেন, ‘সড়কের এমন অবস্থা যেন বাইক নিয়েও এদিক-সেদিক করে এগোনো যাচ্ছে না। প্রায় দিনই আমরা সাধারণ মানুষ বা যানবাহনের যাত্রীরা যেভাবে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছি, তা সহ্য করার মতো নয়। এই বিষয়গুলো যারা বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনে নামেন এবং সরকারের যারা কর্তৃপক্ষ তাদের সবারই বিবেচনা করা উচিত।’
এ প্রসঙ্গে বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘যখন তখন দাবি আদায়ের নামে রাস্তা অবরোধ বা সাধারণ মানুষকে ভোগান্তির মধ্যে না ফেলতে বারবার আমরা অনুরোধ জানাচ্ছি। আশা করি, যারা বিভিন্ন বিষয়ে বা রাজনৈতিক উদ্দেশে আন্দোলন করছেন বা করবেন তারা নগরবাসীর বৃহত্তর স্বার্থে ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটাবেন না। সড়কের শৃঙ্খলা ও নাগরিকদের স্বস্তির জন্য ট্রাফিক পুলিশকে সহায়তা করবেন, এটাই কাম্য।’
গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু এলাকায় সভা-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা: নতুন করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সব ধরনের সভা, সমাবেশ, মিছিল, শোভাযাত্রা ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
ওই গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘সম্প্রতি উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে জনশৃঙ্খলা রক্ষায় ঢাকা মহানগর পুলিশ অর্ডিন্যান্সের ২৯ ধারায় অর্পিত ক্ষমতাবলে গতকাল (বৃহস্পতিবার) থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত প্রধান বিচারপতির সরকারি বাসভবন, বিচারপতি ভবন, জাজেস কমপ্লেক্স, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান গেট, মাজার গেট, জামে মসজিদ গেট, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১ ও ২-এর প্রবেশগেট, বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ভবনের সামনে সব ধরনের সভা-সমাবেশ, মিছিল, শোভাযাত্রা ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হলো।’