নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতার হুমকি, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ঘিরে গুজব ও অপপ্রচার এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আতঙ্ক সৃষ্টির প্রতিবাদ জানিয়েছেন নারীসহ সমাজের প্রগতিশীল মানুষ। পাশাপাশি এ বিষয়ে সরকারকে ব্যবস্থা নিতেও আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া নারীর অধিকার আদায়ের দাবিতে অটল থেকে ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যুক্ত থাকার ঘোষণা দেন নারীরা।
শুক্রবার (১৬ মে) রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ‘নারীর ডাকে মৈত্রী যাত্রা’ অনুষ্ঠানে এক ঘোষণাপত্রে এ আহ্বান জানানো হয়। ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন জুলাই শহিদ পরিবারের তিনজন নারী সদস্য। এতে বলা হয়, ‘নিপীড়িত নারীর বিচার পাওয়ার, মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন ও সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকে। আমাদের লক্ষ্য সম্পত্তিতে নারীর অধিকার ও সব সম্পদে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার। আমরা লড়ছি প্রতিবন্ধী ও সব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। আমাদের লড়াই পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে, বিচারহীনতার বিরুদ্ধে, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্বের বিরুদ্ধে।’
এতে আরও বলা হয়, ‘ওই মৌলিক নীতিগুলোর অধিকাংশই নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন উপস্থাপন করেছে। ফলে এই কমিশন বিলুপ্ত করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত এবং কুৎসিত প্রচারাভিযান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সেই সঙ্গে সরকার গঠিত কমিশনের সদস্যদের ওপর আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় সরকারের নিষ্ক্রিয়তা স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, আমাদের সম্মিলিত অধিকারের একেবারে মৌলিক দাবিগুলোকেও ভয়ভীতি ও হুমকির মাধ্যমে দমন করা হবে। আমরা দেখছি, ঘৃণা-বিদ্বেষের রাজনীতি, হুমকি, সংঘবদ্ধ সহিংসতা অবাধে চলছে। আমাদের ন্যায্য দাবিকে দমন করার চেষ্টা হচ্ছে। আমরা জানতে চাই, সরকার কাকে তোষণ করার চেষ্টা করছে? যে উগ্র-জাতীয়তাবাদ ও চরমপন্থা দুর্বলকে পিষে মারে এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজের সম্ভাবনাকে ভয় পায়, সেই অংশটিকে? গণতন্ত্র ও সংস্কারের নামে যে প্রহসন কেবল বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাকে অক্ষুণ্ন রাখতে চায়, তাকে? এসব আমরা চলতে দেব না।’
ঘোষণাপত্রে বলা হয়, আমরা জানি- অধিকার চেয়ে পাওয়া যায় না, তা আদায় করতে হয়। আমরা তা আদায়ে ভয় পাই না।
যেসব দাবি জানানো হয়:
-অন্তর্বর্তী সরকারকে তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। বিশেষ করে নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতার হুমকি, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ঘিরে গুজব ও অপপ্রচার এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আতঙ্ক সৃষ্টির বিরুদ্ধে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
-নির্বাচনি অঙ্গীকারের মাধ্যমে হোক বা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে হোক-যারা আমাদের সমর্থন চায়- তাদের স্পষ্ট করতে হবে নারী, শ্রমিক, জাতিগত, ধর্মীয়, ভাষাগত ও লিঙ্গীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং এসব জনগোষ্ঠীর পূর্ণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিগত মুক্তির বিষয়ে তাদের অবস্থান। বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচন থেকে তাদের প্রার্থীদের অন্তত শতকরা ৩৩ ভাগ (ক্রমান্বয়ে জনসংখ্যার অনুপাতে) নারী হতে হবে।
-নারী ও প্রান্তিক জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে অন্তর্বর্তী সরকারকে আশু পদক্ষেপ নিতে হবে।
ঘোষণাপত্রে আরও বলা হয়, ‘আমাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও বৈষম্য চালিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা আমরা মেনে নেব না। আমাদের মৌলিক অধিকারগুলোকে অস্বীকার করার ষড়যন্ত্র আমরা প্রতিরোধ করব। বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা, সংস্কৃতি ও ধর্মকে দমনমূলক অস্ত্রে পরিণত করার চেষ্টা আমরা প্রতিরোধ করব। ইতিহাস বিচ্ছিন্ন কূপমণ্ডূকতার মাধ্যমে সহিংসতা ও বৈষম্য চালিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টাকে আমরা কিছুতেই সফল হতে দেব না। আমাদের সংস্কৃতি, ধর্ম ও ইতিহাস দারুণ বৈচিত্র্যময় এবং সংবেদনশীল। সেই বিশালতাকে উপেক্ষা করে আমরা গুটিকয়েক মানুষের সংকীর্ণ ব্যাখ্যাকে সর্বজনীন হতে দেব না। আমরা অধিকার ও ধর্মের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করতে দেব না, মর্যাদা নিয়ে কোনো ধরনের দ্ব্যর্থকতা মেনে নেব না। আমরা সরকার ও প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নারীবিষয়ক অবস্থান নজরদারিতে রাখব। যে ক্ষমতা কাঠামো এসব জুলুমবাজি জিইয়ে রাখে, আমরা সেই কাঠামোকে ভাঙব।’
ঘোষণাপত্রে তারা বলেন, ‘আমরা চুপ করব না, হুমকির মুখে নত হব না। আমরা আমাদের অধিকার আদায়ের দাবিতে অটল থাকব। ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন ও তা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমরা হাল ছাড়ব না। আজ আমাদের সঙ্গে থাকার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ। আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে।’
সভায় ঘোষণাপত্র ছাড়া কারও ব্যক্তিগত মতামত দেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। শুধু সংহতি প্রকাশ করতে এই সভায় অংশ নিতে আহ্বান জানান আয়োজকরা। নারী যাত্রা মৈত্রীর পথে এ আয়োজনে সংহতি জানাতে সমাবেশে অংশ নেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ও দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ইফতেখারুজ্জামান, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান ও নারী অধিকার কর্মী শিরিন পারভিন হক, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী, নারী অধিকার কর্মী খুশী কবির, সীমা মোসলেম, শাহিন আমানসহ নারী অধিকার বিষয়ে সচেতন বিশিষ্টজন।
ঘোষণাপত্র পাঠ শেষে ‘নারীর ডাকে মৈত্রী যাত্রা’র একটি মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলটি মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে ইন্দিরা রোড ঘুরে আবারও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ফিরে আসে।
এর আগে দুপুর থেকে বিকেল গড়াতেই ‘আমাদের নারীর মুক্তিই আমাদের জাতির মুক্তি’, ‘আমার পোশাক, আমার সাজ তোমার কেন গাল-গালাজ’, ‘নারীর নাগরিক নিরাপত্তা- রাষ্ট্রকেই দিতে হবে’, ‘জমি, ঘর, উত্তরাধিকার- সবার চাই সমান অধিকার’, ‘ঘরে বাইরে প্রতিষ্ঠানে ব্যাটাগিরি চলবে না’ প্রভৃতি স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের বিপরীত পাশে জড়ো হতে থাকেন নারী অধিকার ও মানবাধিকার সচেতন শত শত প্রগতিশীল মানুষ। এ আয়োজনটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকায় এখানে জড়ো হতে থাকেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা-দল ও গোত্রের নারী-পুরুষ সবাই। একই সঙ্গে এতে সংহতি জানিয়েছে ৫১টির বেশি প্রগতিশীল নারী, শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক, শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠন।
বেলা ৩টায় শুরু সাংস্কৃতিক আয়োজন। এতে নারীর অধিকার বিষয়ে বিভিন্ন সচেতনতামূলক বার্তা তুলে ধরা হয় গান ও মঞ্চ পরিবেশনায়। এতে অংশ নেন চা-শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীরা।