গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলতে গিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। আগের মেয়রের আমলে ওই ফান্ডের টাকা খরচ করে ফেলায় এ সংকট দেখা দিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, চাকরি শেষ করার পর একজন পেনশনার এককালীন অর্থ পেয়ে থাকেন। ওই টাকা বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থার পাশাপাশি একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী পারিবারিক বিভিন্ন কাজে লাগাতে পারেন। কিন্তু চসিক থেকে তাদের প্রতি মাসের কিস্তির চেকের মাধ্যমে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা দেওয়া হচ্ছে। এতে ওই টাকা আর বিনিয়োগের সুযোগ থাকছে না।
যে টাকার ওপর নির্ভর করে তারা ভবিষ্যৎ সাজানোর পরিকল্পনা করেছিলেন, সেগুলো প্রতি মাসে খরচ হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া যে প্রতিষ্ঠানে তারা জীবনের সবটা ব্যয় করেছেন, সেই প্রতিষ্ঠানেই প্রতি মাসে এসে চেক সংগ্রহ করতে গিয়ে তাদের এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে। চসিকের কাছে সংস্থাটির সাবেক চার শতাধিক কর্মীর পাওনা রয়েছে অন্তত ৬০ কোটি টাকা।
কথা হয় চসিকের একাধিক সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে। কিন্তু ভবিষ্যৎ জটিলতা এড়াতে তারা কেউ গণমাধ্যমে নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তাদের মধ্যে একজন বলেন, ‘জীবনের ৫৯ বছর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন শেষে কর্মস্থল থেকে আমি অবসরে গিয়েছি। গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থপ্রাপ্তি আমার অধিকার। কিন্তু সেই অর্থের জন্য আমাকে যখন যে মেয়র চেয়ারে বসেন তার দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতে হচ্ছে। ভিক্ষুকের মতো আবেদন করতে হয়।’
চসিকের রাজস্ব শাখায় কাজ করে অবসরে গেছেন এমন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘তিন দশক ধরে ধীরে ধীরে এই সংকট তৈরি হলেও গত এক দশকে তা প্রকট আকার ধারণ করে। বর্তমানে গ্র্যাচুইটির বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৬০ কোটি টাকা। অথচ করপোরেশনের বার্ষিক বাজেট ২ হাজার কোটি টাকার বেশি। বর্তমানে চসিকের ফান্ডে ২০০ কোটি টাকার বেশি জমা আছে। বর্তমান মেয়রের উদ্যোগে চসিকের রাজস্ব আয়ও বহুগুণ বেড়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ অতীতে যেখানে ৪০ কোটি টাকা গৃহকর দিত, বর্তমানে তা ১৬০ কোটি টাকা দিচ্ছে। এতেই বোঝা যায় অর্থের অভাব নয়। মূল সমস্যা হলো আন্তরিকতা অভাব।’
চসিকের আওতাধীন সাবেক এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের প্রতি মাসে ৫০ হাজার করে কিস্তিতে টাকা দেওয়া হচ্ছে। এতে ৩০ লাখ টাকা তুলতে পাঁচ বছর সময় লাগবে। অথচ ওই টাকা এককালীন ব্যাংকে রাখলে মাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকা মুনাফা পাওয়া যেত। কিস্তিও পরিশোধ করা হচ্ছে চেকের মাধ্যমে। সেই চেক নিতে প্রতি মাসে একজন অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধকে নগর ভবনের আসতে হয়। তখন ভোগান্তির পাশাপাশি অর্থ অপচয় ও অপমানের সম্মুখীন হতে হয়।’
একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, এককালীন অর্থ না পেয়ে অনেকে গৃহনির্মাণ, মেয়ের বিয়ে, নিজের চিকিৎসা বা পরিবারের জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারছেন না। এতে তাদের মধ্যে অনেকে সংকটে পড়েছেন। অনেকেই একাধিক জটিল রোগে ভুগছেন। কিন্তু প্রতি মাসের টাকায় সংসার চালানোর পর নিজের চিকিৎসার জন্য বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে পারছেন না। যাদের বাড়ি চট্টগ্রামের বাইরে তাদের অনেককেই প্রতি মাসে কিস্তির চেক নিতে এসে রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড বা মসজিদে রাত কাটাতে হচ্ছে।
এদিকে কোনো কোনো কর্মচারী তাদের টাকা না পাওয়ার জন্য হিসাব বিভাগকে দুষছেন। তাদের অভিযোগ, গ্র্যাচুইটির অর্থ এককালীন দিলে হিসাব বিভাগের কমিশন পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। কিন্তু ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করলে সেখানে নির্ধারিত হারে উৎকোচ নেওয়ার সুযোগ থাকে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চসিকের প্রধান হিসাবরক্ষক হুমায়ুন কবির খবরের কাগজকে বলেন, ‘চার শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রায় ৬০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের আমলে প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং গ্র্যাচুইটির তহবিলের টাকা খরচ করে ফেলা হয়েছিল, যা আর পূরণ করা সম্ভব হয়নি। তবে ধীরে ধীরে আমরা সংকট কাটিয়ে উঠছি।’
ঠিকাদারদের বিল দেওয়ার প্রতি বেশি আগ্রহ থাকার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ঠিকাদারদের বিলও অল্প অল্প করে দেওয়া হচ্ছে। বেতন-ভাতা পরিশোধের পর যে টাকা বাঁচে তা পাওনাদারদের ভাগ করে দেওয়া হয়। প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং গ্র্যাচুইটির টাকাও একইভাবে পরিশোধ করা হচ্ছে। আ জ ম নাছির উদ্দীনের আমলে চসিকের প্রায় হাজার কোটি টাকার দেনা হয়, যা এখন ৪০০ কোটিতে নেমে এসেছে।’ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ অসত্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অনেকেই মাসিক কিস্তির পাশাপাশি চিকিৎসা, মেয়ের বিয়েসহ জরুরি কাজের জন্য মেয়রের অনুমোদন নিয়ে কয়েক লাখ টাকার চেকও নিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মধ্যে কিছু সমস্যা আছে। অবসর কল্যাণ তহবিল থেকে তারা কিছু টাকা পান। সেই টাকাটা চসিকে জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু তারা তা জমা দেননি। এ কারণে ১৪১ জনের প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকার গ্র্যাচুইটি নিয়ে অডিট আপত্তি হয়েছে। দুই বছর আগে দেওয়া এই আপত্তির এখনো সুরাহা করা যায়নি।’
চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরাও চাই অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে পাওনা মিটিয়ে দিতে। কিন্তু আর্থিকসংকটের কারণে কিস্তি করে তাদের পাওনা মেটাতে হচ্ছে।’ চসিকের এখনো প্রায় ৪০০ কোটি টাকা দেনা থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘করপোরেশনের আর্থিকসংকট ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে। যত দ্রুত সম্ভব তাদের পাওনা পরিশোধের চেষ্টা করব।’