‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ বাতিলের দাবিতে সচিবালয়ে চলমান আন্দোলন এক দিনের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ মে) সচিবালয়ে ভূমিসচিবসহ পাঁচ সচিবের সঙ্গে আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান বাংলাদেশ সচিবালয় সংযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মো. বাদিউল কবির।
তিনি বলেন, এক দিনের জন্য চলমান আন্দোলন স্থগিত করা হয়েছে। ফলে বুধবার (আজ) ঐক্য পরিষদের কোনো কর্মসূচি থাকবে না।
এর আগে গত শনিবার থেকে গতকাল পর্যন্ত টানা চার দিন সচিবালয়ে বিক্ষোভ আন্দোলন কর্মসূচি পালন করে কর্মচারীদের এই সংগঠন।
কর্মচারীদের দাবি-দাওয়াসংক্রান্ত আলোচনা শেষে ভূমিসচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ বলেন, ‘সরকার একটা আইন করেছে। তারা এ বিষয়ে সংক্ষুব্ধ হয়েছে। আইনটি বাতিল চেয়েছে। আমরা তাদের দাবির সারাংশ বুধবার মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে উপস্থাপন করব। পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। এ জন্য কর্মচারীদের আপাতত আন্দোলন বন্ধ রাখতে বলেছি।’ তিনি বলেন, আলোচনার স্বার্থে আন্দোলনকারীরা তাদের কর্মসূচি স্থগিত করেছেন।
একই প্রসঙ্গে সভাপতি মো. বাদিউল কবির বলেন, ‘মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে আলোচনা করা পর্যন্ত আমরা আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিত রাখব। তবে দাবি আদায় না হলে বৃহস্পতিবার থেকে আবার আন্দোলন চলবে।’
এদিকে পাঁচ সচিব এবং বাংলাদেশ সচিবালয়ে সংযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের অনুষ্ঠিত বৈঠকের একটি সূত্র খবরের কাগজকে জানিয়েছে, কর্মচারীদের পক্ষ থেকে বৈঠকে জানানো হয়েছে, তারা বিক্ষোভ মিছিল করলেও শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়েছেন।
এ সময় তারা তাদের আচরণ নিয়েও খুব সচেতন ছিলেন, যাতে সবার আচরণ ঠিক থাকে। যেহেতু তারা সচিবালয়ে কর্মরত, তাই তাদের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের ফলে বাইরে যাতে কোনো ভুল মেসেজ না যায়। সবাই যাতে তাদের এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে উদাহরণ হিসেবে বিচার করেন। তারা এও জানিয়েছেন, সচিবালয়ের গেটে তালা দেওয়া বা বন্ধ করার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নাই। আন্দোলন করেছেন দাবি আদায়ের লক্ষ্যে, কিন্তু কোনো ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ করেননি। কর্মচারীদের প্রতিনিধিরা আলোচনা সভায় দাবি করেছেন, সচিবালয়ের গেটে তালা বন্ধের কথা জেনে তাদের নিজেদের উদ্যোগে সেই তালা খুলে দিয়ে সচিবালয়ের চলাচলকে স্বাভাবিক হতে সহায়তা করেছেন।
এ সময় ভূমিসচিব সবার উদ্দেশে বলেছেন, ‘কোনো কোনো বিষয়ে কেউ কেউ সংক্ষুব্ধ হতেই পারেন। এ জন্য আন্দোলন করতে হবে কেন। সবাই মিলে যেকোনো সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা যায়। কারণ আমরা যারা সচিবালয়ে কাজ করি, সবাই একটা পরিবারের সদস্য।’
এ সময় বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের একাংশের সভাপতি মো. নুরুল ইসলাম বলেন, বিদ্যমান আইনটি সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি আগে কর্মচারীদের সঙ্গে আলোচনা হতে পারত। কিন্তু সেটা করেননি সংশ্লিষ্টরা। এটা ঠিক হয়নি। এই অধ্যাদেশের কারণে কাজের পরিবেশ নষ্ট হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো ইচ্ছা-অনিচ্ছা থাকবে না। ঊর্ধ্বতনের কথা মতো চলতে হবে। স্বাধীনতা থাকবে না। কর্তার নির্দেশই হবে শেষ কথা। কোনো প্রতিবাদ করা যাবে না বা অনিচ্ছা প্রকাশ করা যাবে না। এতে নির্যাতনসহ পারিবারিক কাজে কোনো কর্মচারীকে সংশ্লিষ্ট করলেও কোনো প্রতিবাদ করা যাবে না। প্রতিবাদ করলেই শোকজ হবে, চাকরি চলে যাবে। তাই এমন নিপীড়নমূলক কালো আইন অবশ্যই বাতিল করতে হবে বলে আলোচনা সভায় দাবি জানান তিনি।
আলোচনার একপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের অপর এক সচিব কর্মচারীদের আন্দোলনের প্রতি নৈতিক সমর্থন জানিয়ে বলেন, এই অধ্যাদেশ ব্যক্তিস্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করবে। কাজের স্বাধীনতা নষ্ট করবে। ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হবে। স্বতঃস্ফূর্ততা থাকবে না। ফলে এ নিয়ে অস্থিরতা শুরু হলে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হবে। ৪৬ বছর আগে একবার এমন অধ্যাদেশ হয়েছিল উল্লেখ করে এই সচিব বলেন, বাতিল হয়ে যাওয়া অধ্যাদেশটি আবার এই সময়ে জারি করা দুঃখজনক ঘটনা।
এর আগে কর্মচারীদের চলমান আন্দোলন কেন্দ্র করে গতকাল সকালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নিজ দপ্তরে কয়েকজন সচিবকে নিয়ে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশিদ। ওই বৈঠকে সরকারি কর্মচারী (সংশোধিত) অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে একটি সূত্র খবরের কাগজকে নিশ্চিত করেছে। তথ্যমতে, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবকে প্রধান করে একটি রিভিউ কমিটি গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই সভা থেকেই কর্মচারী নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে ভূমিসচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এ ছাড়া সচিবালয়ে কর্মচারীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সোমবার রাতে পরের দিন অর্থাৎ মঙ্গলবার সচিবালয়ে দর্শনার্থী প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন জননিরাপত্তা বিভাগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সচিবালয় সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। তাই সার্বিক নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে জননিরাপত্তা বিভাগ।
এদিকে সচিবালয়ে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রবেশ করতে চাইলেও কোনো সাংবাদিককে সকালে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে সচিবালয়ে দায়িত্বরত ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অবশ্য বেলা দেড়টার পর সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনের জন্য সচিবালয়ের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কর্মচারীদের আন্দোলন যাতে কোনো ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির দিকে না যায় এবং সচিবালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা বিবেচনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন ছিলেন। এদিন সচিবালয়ের প্রবেশপথে মোতায়েন ছিল সোয়াট, র্যাব, পুলিশ, বিজিবি, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য।
সচিবালয়ের ভেতরে অধ্যাদেশ বাতিলের দাবিতে আন্দোলনরত কর্মচারীদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে সরকারি বৈষম্যবিরোধী কর্মচারী ঐক্য ফোরাম।
এদিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সচিবালয়ের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সরকারি বৈষম্যবিরোধী কর্মচারী ঐক্য ফোরামের সভাপতি এ বি এম আব্দুস ছাত্তার বলেন, ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ বাতিলের দাবিতে চলমান আন্দোলনে তাদের সংগঠন একাত্মতা প্রকাশ করেছে।
তিনি বলেন, যে কালো আইনটা হয়েছে সেটার বিরুদ্ধে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আন্দোলন করছেন। বর্তমান সরকার যে আইন করেছে, ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলেও এ ধরনের আইন ছিল না।
আব্দুস ছাত্তার বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যারা দোসর তাদের তালিকা কিন্তু প্রকাশ করা হয়েছে। তারা এখনো প্রশাসনের শীর্ষ মহলে বসে আছেন। কেন? তাদের থাকার তো কোনো নৈতিক অধিকার নেই। কিন্তু তারা এই সরকারকে ব্যর্থ করার জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল দাবি ছিল আওয়ামী দোসরদের শীর্ষ পদ থেকে অপসারণ করতে হবে। এখন যেটা শুরু হয়েছে সেটা কালো আইন নিয়ে। এই আইনে সরকার যেকোনো সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাকে বিনা নোটিশে চাকরিচ্যুত করতে পারে। এটা তো হতে পারে না। এটা তো কোনো সভ্য জাতির আইন হতে পারে না।’
তিনি বলেন, এই আন্দোলনটা এখন আর সচিবালয়ে নাই, দেশের সব অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, সব সংস্থা, মাঠপর্যায়ের ডিসি অফিস, ইউএনও অফিস পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এতে রাষ্ট্রের কাজের ক্ষতি হচ্ছে। সরকারের মধ্যে কিছু এজেন্ট ঢুকে পড়েছে অভিযোগ করে প্রশাসনের সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, তারা সরকারপ্রধানকে বিভ্রান্ত করে এসব কাজ করাচ্ছেন।