বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র হিসেবে শপথ না পড়ানোয় টানা আন্দোলন করছেন তার সমর্থক ও নেতা-কর্মীরা। এতে নগর ভবনের বিভিন্ন কক্ষ বন্ধ থাকায় অফিস করতে পারছেন না কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ফলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সিটি করপোরেশনের নিয়মিত সেবা কার্যক্রম।
কর্তৃপক্ষ বলছে, সিটি করপোরেশনে রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনিশ্চিত হওয়ায় মাঠে কাজ করা যাচ্ছে না। ধারাবাহিক আন্দোলনের কারণে প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় নাগরিক সেবা যেমন- লাইসেন্স প্রদান, ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন, নতুন হোল্ডিং নাম্বার প্রদানসহ হোল্ডিং ট্যাক্সসংক্রান্ত কাজ, জন্মনিবন্ধনসহ অন্যান্য জরুরি পরিষেবা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। সংস্থাটির দুটি সেবা (বর্জ্য অপসারণ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ) বাদে বাকি সব নাগরিক সেবা বন্ধ রয়েছে। এ অচলাবস্থা না কাটলে নাগরিক দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীন ৭৫টি সাধারণ ওয়ার্ড রয়েছে। সাত-আটটি ওয়ার্ড মিলে একটি আঞ্চলিক জোন অফিস গঠিত। এমন ১০টি আঞ্চলিক অফিস রয়েছে দক্ষিণ সিটিতে। প্রতিটি আঞ্চলিক অফিসে একজন নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োজিত রয়েছেন। এই নির্বাহী কর্মকর্তার অধীনে ‘ওয়ার্ড সচিব’রা সরাসরি নাগরিক সেবা দিয়ে থাকেন। এমন পাঁচজন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে খবরের কাগজের।
তারা জানান, আন্দোলনকারীরা আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের অফিসে আসতে নিষেধ করেছেন। যদিও কোনো অফিসে তারা তালা ঝোলাননি। কিন্তু আন্দোলনকারীরা ওয়ার্ড কার্যালয় ও আঞ্চলিক অফিসে প্রতিনিয়ত ঘোরাফেরা করেন। কোনো কর্মকর্তা অফিসে গেলে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ওয়ার্ড সচিবরা আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার ওপর নির্ভরশীল। আবার আঞ্চলিক কর্মকর্তা নগর ভবনের ওপর নির্ভরশীল। কেউ অফিস করতে না পারলে নাগরিকরা সেবা পাবেন কী করে- এমন প্রশ্ন রেখেছেন কর্মকর্তারা।
এদিকে ওয়ার্ড সচিবরা জানিয়েছেন, নগর ভবন বন্ধ থাকলেও কিছু কার্যক্রম চালানো যায়। যেমন- রাস্তাঘাট, নর্দমা, ঝোপঝাড় এবং অন্যান্য স্থান থেকে বর্জ্য অপসারণ করা। কিন্তু এসবের জন্য কীটনাশকসহ অন্য মেডিসিন বিতরণ করা হয় আঞ্চলিক অফিস থেকে। আবার আঞ্চলিক অফিস তা সংগ্রহ করে নগর ভবন থেকে। গত কয়েক দিনের টানা আন্দোলনের কারণে সেই বিতরণ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তাই ওয়ার্ড পর্যায়ে নাগরিক সেবাও বিঘ্নিত হচ্ছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের আঞ্চলিক অফিসে তালা ঝোলানো হয়নি বটে; তবে আন্দোলনকারীরা অফিসে আসতে নিষেধ করেছেন। গেলেও তাদের কাছে তথ্য চলে যাচ্ছে। ওয়ার্ড পর্যায়ে সচিবরা আমাদের ওপর নির্ভরশীল। আমরাও নগর ভবনের কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরশীল। নগর ভবনে যেহেতু কার্যক্রম হচ্ছে না, তাই নাগরিক সেবাও দেওয়া যাচ্ছে না।’
১ ও ৪ নম্বর এই দুটি আঞ্চলিক অফিসের নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী সালেহ মুস্তানজির। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘কিছু কাজ অফিসে না গেলে করা যায় না। আমার অফিসও নগর ভবনের ভেতরে। ভবন যেহেতু বন্ধ রয়েছে, আমিও কিছু করতে পারছি না। তাই সেবা কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। আপনাকে ঢুকতে না দিলে আপনি অফিস করবেন কীভাবে?’
নতুন যোগ দিয়েছেন, তবে কোনো কার্যক্রম চালাতে পারছেন না ৫-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা আবু আসলাম। তিনি বলেন, অফিসে না থেকে যে কাজগুলো করা যায়, সেগুলো করার চেষ্টা করছি।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ সেবার মধ্যে রয়েছে- রাস্তা, ড্রেন, পার্ক এবং খেলার মাঠের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ, সিটি করপোরেশনের রাস্তা, ড্রেন, ফুটপাত, ব্রিজ, কালভার্ট এবং খেলার মাঠ তৈরি ও মেরামত।
জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন: সিটি করপোরেশন জন্ম ও মৃত্যুর নিবন্ধন করে থাকে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবা।
স্বাস্থ্যসেবা: সিটি করপোরেশন নগরবাসীর স্বাস্থ্যসেবার জন্য হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং মাতৃসদন পরিচালনা করে। তারা সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধে কাজ করে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়।
পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম: সিটি করপোরেশন শহরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রাস্তা ঝাড়ু দেওয়া ও অন্যান্য পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করে।
ট্রেড লাইসেন্স প্রদান: সিটি করপোরেশন ব্যবসা পরিচালনার জন্য ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করে থাকে।
হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়: সিটি করপোরেশন হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় করে, যা শহরের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহৃত হয়।
মশক নিধন: সিটি করপোরেশন মশা নিধনের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা: সিটি করপোরেশন দুর্যোগের সময় ত্রাণ বিতরণ, উদ্ধার কার্যক্রম এবং দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
অন্যান্য সেবার মধ্যে রয়েছে- লাইব্রেরি, কমিউনিটি সেন্টার, কবরস্থান/ শ্মশানঘাট, গণশৌচাগার, শরীরচর্চা কেন্দ্র (ব্যয়ামাগার), সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র (কমিউনিটি সেন্টার), মাতৃমঙ্গল কেন্দ্র, রাস্তার গাড়ি পার্কিং, পার্ক এবং অন্যান্য বিনোদনমূলক স্থান পরিচালনা করে সিটি করপোরেশন। এ ছাড়া তারা বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের আয়োজন করে থাকে। বর্তমান আন্দোলনের কারণে এসব সেবার বড় অংশই নাগরিকরা পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. জিল্লুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের অফিসারদের ঢুকতে (সিটি করপোরেশনে) দিচ্ছে না। অফিস না করতে পারলে কাজ হবে কী করে? কোনো ফাইল এগোচ্ছে না। অফিসে ফাইল ঢুকতেও পারছে না, বেরও করা যাচ্ছে না। ওয়ার্ড পর্যায়ের অনেক সেবা অফিস থেকে বিতরণ করা হয়, যা এখন করা যাচ্ছে না। এখন সিটি করপোরেশনের মিটিং করতে হচ্ছে মন্ত্রণালয়ে। তাহলে সেবা কার্যক্রম কীভাবে চলবে? কারও নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, প্রতিদিনই শিশু জন্ম নিচ্ছে। ওদের পরিচয়পত্রও দেওয়া যাচ্ছে না। এমন অনেক বিষয় রয়েছে।