কিট সংকটে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা পরীক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। একইভাবে কিট সংকটে খুলনা জেনারেল হাসপাতাল থেকেও করোনা পরীক্ষা না করেই ফিরতে হচ্ছে আগতদের। এতে বিপাকে পড়েছেন অসুস্থ ব্যক্তি, অপারেশনের রোগী ও বিদেশগামী কর্মীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সরেজমিনে শনিবার (২১ জুন) সকালে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকে মালদ্বীপ প্রবাসী তিন শ্রমিক করোনা পরীক্ষা সার্টিফিকেটের জন্য অপেক্ষা করছেন। এর মধ্যে তেরখাদার ইলিয়াছ মোল্লার প্লেনের টিকিট রয়েছে ২৩ জুন। কিন্তু করোনা কিট সংকটে পরীক্ষা করাতে না পেরে তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন।
বললেন, ‘যখন বিদেশ থেকে দেশে আসি তখন করোনার প্রকোপ ছিল না। এখন বিমানবন্দর থেকে বাইরের দেশে যেতে চাইলে ‘করোনা নাই’ মর্মে এমন সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হয়। বৃহস্পতিবার (১৯ জুন) এই হাসপাতালে এলে চিকিৎসকরা কিট নেই বলে জানান। শনিবার সকাল থেকে হাসপাতালে বসে আছি। আজও কিট পাওয়া যাচ্ছে না। খুলনা জেনারেল হাসপাতালে খোঁজ নিয়েছিলাম, সেখানেও কোনো কিট নেই। এখন করোনা সার্টিফিকেট নিতে না পারলে বিদেশে কর্মস্থানে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই হাসপাতালে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে মজুত করা করোনার কিট এরই মধ্যে মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় খুলনা জেনারেল হাসপাতাল থেকে ১০০টির মতো কিট এখানে আনা হয়। কিন্তু এরই মধ্যে সেসব কিট নমুনা পরীক্ষায় ব্যবহার করা হয়েছে। জানা যায়, খুলনা জেলায় এ পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষায় চারজনের করোনা শনাক্ত হয়। এর মধ্যে বর্তমানে একজন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বাকিরা শারীরিকভাবে সুস্থ থাকায় তাদের বাড়িতে রেখে চিকিৎসা নিতে বলা হয়েছে।
তেরখাদার বারাসাত গ্রামের আবদুল কাইয়ুম মোল্লা জানান, করোনার সার্টিফিকেট না থাকায় তিনি ভিসা থাকলেও বিদেশে যেতে পারছেন না। বিমানের টিকিট সংগ্রহ করতে গেলে সেখান থেকেই তাকে করোনার সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে বলা হয়। কিন্তু খুলনায় কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরেও তিনি করোনার সার্টিফিকেট জোগাড় করতে পারেননি। সময়মতো কর্মস্থলে ফিরতে না পারলে চাকরি হারাতে হবে। ফলে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
একইভাবে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অপারেশনের জন্য ভর্তি থাকা রোগীরাও করোনার নমুনা পরীক্ষার অভাবে ভোগান্তিতে রয়েছেন। সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা কোহিনুর বেগমের স্বামী মনিরুল ইসলাম জানান, অপারেশনের আগে চিকিৎসকরা ‘করোনা নেই’ মর্মে নিশ্চিত হতে চাচ্ছেন। কিন্তু এই হাসপাতালে কিট না থাকায় তারা দুদিন ধরে অপেক্ষায় রয়েছেন।
এদিকে হাসপাতালে করোনা পরীক্ষার জন্য আসা লোকজনের চাপ বাড়তে থাকায় শনিবার দুপুরের দিকে কিছু কিট বাইরে থেকে সংগ্রহ করে আনে কর্তৃপক্ষ। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটের মুখপাত্র ডা. খান আহমেদ ইশতিয়াক জানান, করোনা পরীক্ষার কিট শেষ হয়ে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার থেকে করোনা পরীক্ষা বন্ধ ছিল। কিন্তু শনিবার জরুরিভাবে কিছু কিট সংগ্রহ করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নমুনা পরীক্ষা শুরু করা হয়েছে।
অপরদিকে খুলনা মেডিকেল কলেজে নমুনা পরীক্ষার আরটি-পিসিআর ল্যাবটিও নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। সেখানে যন্ত্রাংশের ত্রুটির কারণে করোনা নমুনা পরীক্ষা করা যাচ্ছে না। পিসিআর ল্যাবটি নতুন করে সেট করা এবং কিট চেয়ে অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
এদিকে খুলনায় সচেতন নাগরিকদের সংগঠন খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার জানান, করোনা সংক্রমণ ও নমুনা পরীক্ষা নিয়ে হেলাফেলা করলে বড় ধরনের বিপদ আসতে পারে। তিনি খুলনার হাসপাতালগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে নমুনা পরীক্ষার কিট সরবরাহের দাবি জানান। সেই সঙ্গে আরটি-পিসিআর ল্যাবের কারিগরি ত্রুটি মেরামত করে চালুর দাবি জানান।
খুলনা মেডিকেল কলেজে আরটি-পিসিআর ল্যাব বন্ধের বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ ডা. গোলাম মাসুদ জানান, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় ক্যালিব্রেশন (যন্ত্রকে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেট করা) দরকার হয়। এ ছাড়া কিটের সংকট রয়েছে। এসব বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে বিভাগীয় স্বাস্থ্য উপপরিচালক মুজিবর রহমান জানান, খুলনা জেলায় কিট সংকট রয়েছে। তবে যশোরসহ আরও কয়েকটি জেলায় করোনার নমুনা পরীক্ষা চলমান রয়েছে। যে হাসপাতালগুলোতে কিট নেই, সেখানে কিছুটা বিলম্ব হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী কিট সরবরাহ করা হচ্ছে।