বহুল আলোচিত পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পে দুর্নীতির মামলাটি ১১ বছর পর আবার চালু হচ্ছে। যথেষ্ট উপাদান ও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মামলা থেকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন।
একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ ছিল। বিগত সরকারের সময়ে গায়ের জোরে মামলাটি বসিয়ে দেওয়া হয়। এখন এটি পুনরুজ্জীবিত করে স্বয়ংসম্পূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে।’ ২০১২ সালে মামলাটি দায়ের হয় এবং তদন্ত শেষে ২০১৪ সালে এফআরটি (ফাইনাল রিপোর্ট ট্রু) দেওয়া হয়।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা জানান। তিনি বলেন, ‘পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়ে যে বিভ্রান্তি ছিল, সেটা নিয়ে মামলা করা হয়। মামলার উপাদানগুলো সঠিক থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত আদালতে এফআরটি দাখিল করা হয়। গত ডিসেম্বরে নতুন কমিশনের কাজ শুরু হলে আমরা এটি পুনরায় বিবেচনা করি। আমাদের মনে হয়েছে, অনেকটা গায়ের জোরে মামলাটি বসিয়ে দেওয়া হয়। এই মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা প্রয়োজন। এ জন্য আমরা নতুন করে তদন্ত শুরু করি।’
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা পিপিএ (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট) ও পিপিআর (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস) পুরোপুরি অনুসরণ করেই কাজ করতে হয়। পিপিএ-পিপিআর অনুসরণ করে যে কাজ করার কথা, পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে যে মূল্যায়ন কমিটি গঠন করার কথা, সে কমিটি উদ্দেশ্যমূলকভাবে কয়েকবার পরিবর্তন করা হয়েছে। অসৎ উদ্দেশ্য বা অপরাধপ্রবণতা এর মধ্যে থেকে যায়, যা প্রমাণিত হয়। আর্থিক মূল্যায়নে পুনঃব্যবহারযোগ্য ব্যয় বাদ দেওয়া হয়নি। বড় প্রকল্প করতে গেলে একই জিনিস অনেকবার ব্যবহার করার সুযোগ থাকে। সে ক্ষেত্রে যে জিনিস একবার ক্রয় করলে বারবার ব্যবহার করা যায়, সেটা কয়েকবার ক্রয় দেখানো সমীচীন নয়- এ রকম কয়েকটি ঘটনা পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঘটেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যখন যৌথ মূল্যায়ন করি, পরামর্শদাতাদের যেসব জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) মূল্যায়ন করার কথা ছিল, সেগুলো সেভাবে করা হয়নি। এখানে অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়েছে। মূল্যায়নের বিভিন্ন জায়গায় পিপিএ-পিপিআর এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। মূল্যায়ন কার্যক্রম চলাকালে কমিটির সদস্যদের যেসব সাক্ষাৎ ও তথ্য গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক ছিল, সেগুলো সেভাবে হয়নি। ফলে আমরা মনে করি, আগের যে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে, তা বাধ্য হয়েই হোক, আর যেভাবেই হোক- ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ। এবার আমাদের তদন্তকারী কর্মকর্তা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিবেদন দাখিল করবেন এবং মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা হবে।’
এদিকে দুদকের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, গত ডিসেম্বরে কমিশনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করতে অধিকতর তদন্ত শুরু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায় পুনরায় চালু করতে সংশ্লিষ্ট আদালতে আবেদন জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে। সে ক্ষেত্রে আদালত সন্তুষ্ট হলে মামলাটি পুনরায় চালু হবে এবং প্রয়োজনীয় বিচারকাজ শুরু হবে।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্মাণকাজে তদারকি ও পরামর্শক নিয়োগসংক্রান্ত দরপত্রের অন্যতম দরদাতা কানাডীয় প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিন ইন্টারন্যাশনালকে কার্যাদেশ পাইয়ে দিতে দুর্নীতি করার অভিযোগে ২০১২ সালের ১৭ ডিসেম্বর সেতু বিভাগের তৎকালীন সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াসহ সাতজনকে আসামি করে বনানী থানায় মামলা করেন দুদকের তৎকালীন উপপরিচালক (বর্তমানে মহাপরিচালক) আবদুল্লাহ আল জাহিদ। আসামি মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে সে সময় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। তাকে সাময়িকভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হলেও পরে তিনি জামিনে মুক্তি পেয়ে আবার চাকরি ফিরে পান। অপর ছয় আসামি ছিলেন সেতু বিভাগের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (নদী শাসন) কাজী মো. ফেরদৌস, সাবেক সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রিয়াজ আহমেদ জাবের, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড প্লানিং কনসালটেন্ট লিমিটেড-ইপিসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা, এসএনসি লাভালিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট কেভিন ওয়ালেস, আন্তর্জাতিক প্রকল্প বিভাগের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রমেশ শাহ ও সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ ইসমাইল। তদন্ত শেষে আসামিদের অব্যাহতি দিয়ে ২০১৪ সালে আদালতে এফআরটি দাখিল করে দুদক।