চট্টগ্রামে হালিশহরের আনন্দিপুরে নালায় পড়ে শিশু হুমায়রার মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)।
এতে হুমায়রার নালায় পড়ার ঘটনার একাধিক কারণ তুলে ধরা হয়েছে। তবে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, প্রতিবেদনে যা-ই বলা হোক না কেন, এর শতভাগ দায় চসিককেই নিতে হবে। গত ছয় বছরে নালায় পড়ে ১৫ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিছক দুর্ঘটনা নয়। আগের ঘটনায় দায়ীদের বিচার না হওয়ায় এমন মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে বিচারবিভাগীয় তদন্তেরও দাবি করা হয়েছে।
গত ৯ জুলাই চট্টগ্রামে নালায় পড়ে মারা যায় তিন বছর বয়সী শিশু হুমায়রা। তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনার জন্য সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে উল্লেখ করা হয়- কর্মস্থলে অপর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, পরিবারের দায়িত্বহীনতা, ভবনের মূল ফটক উন্মুক্ত থাকা এবং সড়কের অবস্থান ও উচ্চতার তারতম্যকে।
সচেতন মহলের মতে, নগরবাসীকে নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য রাখার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। তারা কিছুতেই নালায় পড়ে মানুষ মৃত্যুর দায় এড়াতে পারে না। তা ছাড়া চট্টগ্রাম শহরে নালার ওপর কেউ নিজ খরচে স্ল্যাব বসানোর আগে চসিকের অনুমতি নিতে হয়। প্রতি বর্গফুটে রাজস্ব দিতে হয় বাণিজ্যিক ভবনের সামনে ১ হাজার টাকা এবং আবাসিক ভবনের সামনে হলে ৫০০ টাকা। অর্থাৎ কারও ভবনের সামনে থাকা উন্মুক্ত নালায় নিজ খরচে স্ল্যাব দিতে গেলেও চসিককে ফি দিতে হয়। তাহলে দুর্ঘটনার দায় সংস্থাটি নেবে না কেন?
বিশিষ্ট নগরবিদ ও পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বলেছেন, ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নিজে বাঁচার জন্য নিজের কর্মকর্তা দিয়ে তদন্ত কমিটি করে নিজের পক্ষেই প্রতিবেদন নিয়েছে। কারণ শহরে ব্যক্তিগত কোনো খাল-নালা থাকতে পারে না। প্রতিটি খাল-নালার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। তারা যদি প্রকৃত প্রতিবেদন চাইত নিশ্চয় নিজের লোক দিয়ে কমিটি গঠন করত না।’
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশন বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি এম এ হাশেম রাজু বলেছেন, ‘চসিকের অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে কিছুদিন পরপর শিশু থেকে যুবক, বয়স্ক কেউ না কেউ নালায় পড়ে মারা যাচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে কয়েকদিন আলোচনার পর সবাই ভুলে যায়। এই শহরের নালায় পড়ে গত ছয় বছরে শিশু হুমায়রাসহ ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। কোনোটার দায় সিটি করপোরেশন এড়াতে পারে না। দায়ীদের বিচার হয় না বলে সংশ্লিষ্টরা নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে না। এর পরিবর্তন দরকার। অথর্ব, দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শাস্তির আওতায় আনার জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘যতদিন পর্যন্ত দোষীরা বিচারের মাধ্যমে শাস্তি না পাবে, ততদিন এই শহরের মানুষ নালায় পড়ে মরতে থাকবে। এভাবে চলতে দেওয়া যায় না।’
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের গঠন করা তদন্ত কমিটির প্রধান ও সংস্থাটির প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেছেন, ‘যেই ছোট নালায় পড়ে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে সেটি দেড় ফুটের একটি নালা। যা ওই বাড়ির মালিক পানি নিষ্কাশনের জন্য তৈরি করেছে। এটি স্ল্যাব দিয়ে ঢেকে দেওয়া সম্ভব না।’
শিশুর পরিবার এবং তার মায়ের কর্মস্থল গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করে প্রতিবেদন দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দায় সিটি করপোরেশনকেও দেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থলের বাইলেনের চেয়ে মূল সড়কের উচ্চতা বেশি। এতে পেছনের বড় বিল বা খালি জায়গার পানি বাইলেন দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ওই সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। সড়ক দুটির মাঝে উচ্চতার তারতম্যের জন্য দুটি নালার সংযোগস্থলে ছোট নালার গভীরতা বেড়ে গিয়ে পানি নিষ্কাশনের সময় প্রবল স্রোত সৃষ্টি হয়। যা শিশুটিকে টেনে বড় নালায় নিয়ে গেছে। দুই সড়কের উচ্চতার তারতম্যের জন্য কিন্তু সিটি করপোরেশন দায়ী। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে রবিবার (আজ) থেকে চট্টগ্রাম শহরজুড়ে মাসব্যাপী সচেতনতা মাইকিং করার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।’