রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ী ইউনিয়নে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। এদিকে সিপিবি বলেছে, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর এই হামলা সারা দেশে মানুষের মনে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো পৃথক বিবৃতিতে আসক ও সিপিবি এসব কথা বলেছে।
আসক বিবৃতিতে জানিয়েছে, শুধু এক কিশোরের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে পুরো একটি সম্প্রদায়ের ওপর সংগঠিতভাবে সহিংসতা চালানো হয়েছে, যা একটি সভ্য সমাজের জন্য চরম লজ্জার এবং স্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘনের উদাহরণ।
বিবৃতিতে বলা হয়, অভিযুক্ত কিশোর স্থানীয় একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষার্থী। তাকে পুলিশ আটক করে সাইবার সুরক্ষা আইনে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় মাইকিং করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়ানো হয় এবং সংঘবদ্ধ একটি দল সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা চালায়। এতে বহু ঘরবাড়ি লুটপাট ও ভাঙচুরের শিকার হয় এবং স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
আসক অভিযোগ করে জানায়, ধর্মীয় অনুভূতির অজুহাতে বারবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার যে ধারাবাহিকতা দেশে দেখা যাচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এসব ঘটনায় অধিকাংশ সময় হামলাকারীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি বিচারহীনতার এক ভয়াবহ পরিবেশ তৈরি করছে, যা সংবিধানপ্রদত্ত নাগরিক অধিকারের পরিপন্থি।
সংগঠনটি সংবিধানের ২৭, ২৮ ও ৪১ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে বলেছে, সব নাগরিক ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে বৈষম্যহীনভাবে সমানাধিকার ভোগের অধিকার রাখে। এসব মৌলিক অধিকার বারবার লঙ্ঘিত হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক।
এই প্রেক্ষাপটে আসক দাবি জানিয়েছে; প্রথমত, হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, আক্রান্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, ধর্মীয় উসকানি ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রতিরোধে রাষ্ট্রকে কার্যকর ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যারা হামলা চালিয়েছে এবং যারা দায়িত্বে থেকেও তা প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছে, দুই পক্ষেরই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচারই হবে মানবাধিকারের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা প্রদর্শনের একমাত্র পথ।
সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে: সিপিবি
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম ও সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ‘সংখ্যালঘু নির্যাতন কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয় নয়, এটা রাজনৈতিক সংকটের অংশ।’ রংপুরে সংখ্যালঘুদের টার্গেট করে ‘ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর’ এই হামলা সারা দেশে মানুষের মনে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তারা।
অন্তর্বর্তী সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে তারা বলেন, ‘একটি গোষ্ঠী কার্যত চব্বিশের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে দাঁড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজনের দিকে নিয়ে যেতে চায়। এতে পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তি পুনর্বাসিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এদের সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’
হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি মেরামত করে দিচ্ছে প্রশাসন
আমাদের রংপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, দুর্বৃত্তদের হামলায় ভাঙচুর হওয়া ঘরগুলো মেরামত করে দিচ্ছে সরকার। এলাকাবাসী ও প্রশাসনের সহযোগিতায় ওই হিন্দুপল্লিতে ক্রমেই আতঙ্ক কাটছে বলে জানিয়েছেন অধিবাসীরা।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে গংগাচড়া উপজেলার বেতগাড়ি ইউনিয়নের আলদাদপুর ছয় আনি বালাপাড়া হিন্দুপল্লিতে গিয়ে দেখা গেছে, গংগাচড়া উপজেলা ইউএনওর উদ্যোগে ভাঙচুর হওয়া ঘরগুলো মেরামত করে দেওয়া হচ্ছে। সরকারি টিন এবং সরকার নিয়োজিত মিস্ত্রিদের দিয়ে ঘরের বেড়া এবং ছাদের টিন লাগানোর কাজ চলছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদুল হাসান মৃধা নিজেই কার্যক্রম তদারকি করছেন। পাশাপাশি প্রতিটি হিন্দু পরিবারের সঙ্গে কথা বলছেন তিনি। আশ্বস্ত করছেন পাশে থাকার। এর মধ্যে বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যারা প্রতিবেশীদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তারাও নিজ বাড়িতে ফিরছেন। মিস্ত্রিদের কাজে সহযোগিতা করছেন। তবে ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়া রঞ্জন রায়ের বাবা এবং তার চাচা জয়চাঁদ এই সংবাদ লেখা পর্যন্ত বাড়িতে ফেরেননি।