একটানা বৃষ্টি। চারপাশে পানি। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও জমা পানির উচ্চতা কোমর ছাড়িয়েছে। দিনের শুরুতে কর্মজীবীরা দুর্ভোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে কর্মস্থলে যাচ্ছেন। গণপরিহন চলাচল এক প্রকার বন্ধ হয়ে গেছে। নগরের মোড়ে মোড়ে বিকল হওয়া সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলোর চালকরা টেনে কিংবা কারও সাহায্যে ঠেলে গ্যারেজমুখী হচ্ছেন। কোথাও আবার রাস্তায় জমা পানির ওপর নৌকা চলতে দেখা যাচ্ছে। আগে প্রতিবছর বর্ষা এলে চট্টগ্রাম নগরে চিত্র এমন দেখা যেত। কিন্তু চলতি বছরের বর্ষায় নগরবাসীকে এমন ভোগান্তি পোহাতে হয়নি।
বিষয়টিকে নিজেদের অর্জন দাবি করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে নিজেদের সাফল্যের গীত গাইতে শুরু করেছে। যদিও নগরবিদ ও সচেতন মহল বলছে ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, পরিস্থিতি ইতিবাচক থাকলে সবাই ক্রেডিট নিতে চায়। মূলত, এবার বৃষ্টি কম হয়েছে। তাই কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের মূল পরীক্ষা এখনো শুরুই হয়নি! উল্টো আগে যেসব জায়গায় পানি জমত না, চলতি বছর সেখানেও পানি জমেছে।
মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, ‘২০২৪ সালে বৃষ্টিপাতের কারণে ৮৫টি স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। তবে ২০২৫ সালে জলাবদ্ধতা দেখা দেয় ৩৩ জায়গায়।’ জলাবদ্ধতার সমস্যা কমে আসাকে সাফল্য ভেবে সিটি করপোরেশন নিজেদের নেওয়া পদক্ষেপগুলো চিঠিতে উল্লেখ করে। যদিও প্রতিটি কাজই ছিল সংস্থাটির রুটিন দায়িত্ব। এর মধ্যে ছিল নিয়মিত নালা পরিষ্কার, ড্রেন থেকে মাটি ও বর্জ্য অপসারণ, সচেতনতা তৈরিতে মাইকিংয়ের ব্যবস্থাসহ আরও কিছু পদক্ষেপ।
তবে বাস্তবতা হলো কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসন হলেও নগরের কিছু এলাকায় এ সমস্যা নতুন করে দেখা দিয়েছে। বর্ষার শুরুর দিকে মুরাদপুরসহ অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা না থাকলেও ৭ আগস্টের ভারী বৃষ্টিপাতে সেসব এলাকাতেও জলজট দেখা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নগরে অন্তত ৩০ বার জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এর মধ্যে ২০২৪ সালে ৬ বার, ২০২৩ সালে ১৪ বার ও ২০২২ সালে ১০ বার। আর চলতি বর্ষা মৌসুমেও প্রায় চার দফা তলিয়ে যায় নগরের অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল। নতুন নতুন জায়গায় পানি জমছে। নিকট অতীতেও কখনো জলাবদ্ধতা দেখা দিত না- এমন অনেক জায়গাও গত বৃহস্পতিবার প্লাবিত হয়েছে। নগরের ৫ নম্বর মোহরা ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের জন্য জলাবদ্ধতা অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মোহরা এলাকায় একসময় এভাবে পানি জমত না। এ ছাড়া মেহেদীবাগ, আগ্রাবাদ হোটেলের সামনে, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সামনে, কদমতলী থেকে আগ্রাবাদ চৌমুহনী যাওয়ার সড়ক, নগরের অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকায় আন্দরকিল্লার সিরাজুদ্দৌলা রোড ও সাব-এরিয়া এলাকাতেও পানি জমছে। গত ২৮ জুলাই ১০২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে নগরের অনেক এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পর্যন্ত পানি জমে যায়।
জানতে চাইলে নগরবিদ ও বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, ‘শহরের খাল-নালাগুলো অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার আছে। অন্যদিকে বৃষ্টি ও জলোচ্ছ্বাসও কম হয়েছে। তাই জলাবদ্ধতা কমে গেছে বলে আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই।’
তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় ৩৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত এবং ৫ দশমিক ১৫ মিটার উচ্চতার জোয়ারের রেকর্ড আছে। বৃষ্টি কিংবা জোয়ার কোনোটাই অতীত রেকর্ডের কাছাকাছি যায়নি। বলতে গেলে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের মূল পরীক্ষাটাই এখনো হয়নি। চসিক যেহেতু খাল-নালা রক্ষণাবেক্ষণ করবে। সরকারের উচিত এই প্রতিষ্ঠানকে জনবল, যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষণ সবকিছু দিয়ে সক্ষম করে গড়ে তোলা।’
চিটাগং ডেভেলপমেন্ট ফোরামের মুখপাত্র খোরশেদ আলম বলেছেন, ‘পরিস্থিতি একটু ভালো হলে সবাই ক্রেডিট নেওয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় নামেন। এবার বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। তাই হয়তো শহরের কিছু জায়গায় স্বস্তি মিলেছে।’ তিনি নিজে মোহরা এলাকার বাসিন্দা উল্লেখ করে বলেন, ‘বৃষ্টি ছাড়াই মোহরার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে। জন্মলগ্ন থেকে মোহরায় এত পানি দেখিনি।’ দেশে জলাধার রক্ষার আইন আছে জানিয়ে খোরশেদ আলম বলেন, ‘দিনের বেলা ছাগল জবাই করে উৎসবের আমেজে পুকুর ভরাটের খবর সংশ্লিষ্টদের কানে পৌঁছে দেওয়ার পরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে এটি ছোট একটি উদাহরণ। কেউ নিজের দায়িত্ব পালন করছেন না।’