রাজশাহীতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার বিস্তার। স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী নগরীর ৫৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসারে কোনো এলাকায় ২০ শতাংশের বেশি বাড়িতে এডিস মশার উপস্থিতি ধরা পড়লে সেটি ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচিত হবে। সেই অনুযায়ী রাজশাহী বর্তমানে ডেঙ্গু সংক্রমণের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) এলাকাকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে চিঠি দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (রামেক) সূত্রে জানা গেছে, গত দুই মাসে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীদের বেশির ভাগই স্থানীয়ভাবে আক্রান্ত হয়েছেন। আগে রোগীদের মধ্যে ঢাকায় ভ্রমণের ইতিহাস থাকলেও এবার বেশির ভাগ রোগী রাজশাহী ও আশপাশের জেলা থেকেই আক্রান্ত হয়েছেন। রামেক হাসপাতালে গত দুই মাসে ৩০৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে চারজনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে একজন শিশু।
রামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘এ মৌসুমে ডেঙ্গু নীরবে শুরু হয়েছে। কিন্তু অল্প সময়েই সংক্রমণের মাত্রা শীর্ষে পৌঁছেছে। সবচেয়ে বেশি রোগী আসছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে।’
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্যমতে, জুলাই মাসে রাজশাহী নগরীর পাঁচটি ওয়ার্ডে ৭৫টি বাড়িতে জরিপ চালানো হয়। এর মধ্যে ৩২টি বাড়ির ৪৩টি পাত্রে এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত হয়। এর আগের জরিপগুলোতে (মার্চ ও এপ্রিল) লার্ভা শনাক্তের হার ছিল ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। অথচ জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭ দশমিক ৩৩ শতাংশে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের কীটতত্ত্ব টেকনিশিয়ান আবদুল বারী বলেন, ‘লার্ভা শনাক্তের এ হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এডিস মশার বংশবিস্তার রোধে অবশ্যই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাত্র ব্যবস্থাপনা এবং জনসচেতনতা ছাড়া এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।’
তিনি বলেন, ‘যেসব জায়গায় পানি জমে থাকে যেমন ফুলের টব, ছাদবাগান, ট্যাংক, ডাবের খোসা, পুরোনো খেলনা বা পাত্র, সেগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনা জরুরি। পানির ট্যাংকে মাছ ছেড়ে দিলে সেটিও একটি কার্যকর লার্ভা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি হতে পারে।’
রাজশাহী জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ উম্মে হাবিবা বলেন, ‘এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে মূলত ফুলের টব, ডাবের খোসা, ছাদবাগানের পাত্র, খেলনা হাঁড়ি-পাতিল ও জমে থাকা পানির কনটেইনারে। আমরা ফলাফল সিটি করপোরেশনকে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছি।’
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন বলেন, ‘বর্ষায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। এ সময় বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকে। সিটি করপোরেশন এলাকায় পরীক্ষা করে স্বাস্থ্য বিভাগ ৫৭ শতাংশ এডিস মশার লার্ভা পেয়েছে। আমরা মনে করি, গোটা রাজশাহী নগরীতে মশা রয়েছে। সে অনুযায়ী আমরা কার্যক্রম পরিচালনা করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্ষার সময় আমাদের মূল টার্গেট থাকে পানির প্রবাহ যেন কোথাও বন্ধ না হয়। আমরা প্রতিনিয়ত সব জায়গাতে জঙ্গল পরিষ্কার এবং মানুষকে সতর্কতা করার কাজ করে আসছি। তবে লার্ভা নিধনের মূল কাজটা শুরু হবে বর্ষার পরে।’