দেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত এখন গুরুতর হুমকির মুখে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
সংস্থাটির মতে, এই সংকটের সমাধান না হলে মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের মূল্যায়নে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে রাজস্ব আহরণ ও সুশাসনের সঙ্গে লাল শ্রেণিতে রেখেছে সিপিডি। অর্থাৎ এসব খাতে অবিলম্বে পদক্ষেপ জরুরি।
রবিবার (১০ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে “অন্তর্বর্তী সরকারের ৩৬৫ দিন” শীর্ষক সংলাপে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
তিনি বলেন, 'স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় সেবার মান, নীতি বাস্তবায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে দুর্বলতা দেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সুস্পষ্ট সংস্কার না হলে আগামী প্রজন্মকে এর মাশুল দিতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতগুলোকে ট্র্যাফিক বাতির সঙ্গে তুলনা করে লাল (গুরুতর উদ্বেগের ক্ষেত্র), হলুদ (সতর্কবার্তার ক্ষেত্র) ও সবুজ (ইতিবাচক অগ্রগতির ক্ষেত্র) শ্রেণিতে বিভক্ত করেছে সিপিডি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বিনিয়োগ পর্যাপ্ত নয়। হাসপাতালগুলোতে অবকাঠামোর ঘাটতি, কর্মী সংকট আর সুলভ ওষুধের অভাব এখনো প্রকট। শিক্ষাখাতেও উন্নতি নেই- শিক্ষক সংকট, শিখনের নিম্ন মান, শহর-গ্রামের বৈষম্য চলমান। এ ছাড়া রাজস্ব আহরণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় অনেকটাই পিছিয়ে, ঘাটতি রয়ে গেছে সরকারি ক্রয়ে সুশাসনের ক্ষেত্রে। ব্যাংকিং, জ্বালানি ও ভূমি খাতের সংস্কার হচ্ছে ধীর গতিতে। ক্রমবর্ধমান বৈষম্য সামাজিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
সতর্কবার্তার ক্ষেত্র
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের মতো বিষয়কে মধ্যম পর্যায়ের হুমকি হিসেবে গণ্য করছে সিপিডি। গত বছরের তুলনায় দাম কিছুটা কমলেও খাদ্যদ্রব্যের মূল্য এখনো বেশি। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। চাকরির সুযোগ তৈরি হয়েছে খুব কম, বিশেষ করে গ্রামে ও অনানুষ্ঠানিক খাতে। পোশাক ছাড়াও ইলেকট্রনিক্স, ওষুধ ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত খাতে রপ্তানির চেষ্টা তেমন ফল দেয়নি।
এই ক্ষেত্রগুলো ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে আছে। যথাযথ নীতি সহায়তা পেলে এগুলো ইতিবাচক খাতের কাতারে উঠে আসবে। ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যর্থ হলে গুরুতর হুমকির পর্যায়ে নেমে যাবে।
ইতিবাচক অগ্রগতির ক্ষেত্র
কিছু কিছু খাতে অগ্রগতিও হয়েছে, যেমন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্থিতিশীলতা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানো, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকি সংস্কার ও সরকারি সেবা ডিজিটালাইজেশনে অগ্রগতি।
প্রতিবেদনটি ৩৮টি সূচকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেছে। এর মধ্যে ১১টি লাল বা গুরুতর হুমকির পর্যায়ে, ১৮টি হলুদ বা মধ্যম পর্যায়ের হুমকির মধ্যে আর ৯টি সবুজ বা ইতিবাচক। এই চিত্রটি মিশ্র। তবে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি ভঙ্গুর বলে মনে করে সিপিডি।
করণীয়
এই পরিস্থিতিতে সিপিডির সুপারিশ হলো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বাজেট বাড়ানো ও ব্যয় দক্ষতা বাড়ানো হোক। কর প্রশাসন জোরদার করে রাজস্বের উৎস বিস্তৃত করতে হবে; ব্যাংকিং খাতে কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোতে দ্রুত সংস্কার আনতে হবে।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, এক বছরে কাঠামোগত সব সমস্যা মিটবে না ঠিক, কিন্তু সঠিক পথে যাত্রা শুরু ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখানোর জন্য এটি যথেষ্ট সময়।
সংলাপে নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা একমত হন- সরকারের বাকি সময়ে লাল ও হলুদ খাতগুলোকে টেকসই সবুজ সাফল্যে রূপ দিতে হবে, যাতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি মানব উন্নয়নের গতি নিশ্চিত হয়।
মেহেদী/