আজ বাবা দিবস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য ছবি, শুভেচ্ছা, স্মৃতিচারণ আর আবেগঘন বার্তায় ভরে উঠবে দিনটি। কেউ বাবার সঙ্গে তোলা পুরোনো ছবি পোস্ট করবেন, কেউ লিখবেন বাবার ত্যাগের গল্প, কেউ হয়তো বাবাকে হারানোর বেদনা জানাবেন। কিন্তু এই আবেগঘন দিনের মাঝখানে আমাদের একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়–আমরা কি সত্যিই আমাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি, নাকি আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি যেখানে প্রজন্মগুলো ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বসবাস করছে!
বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো পরিবর্তনের অসম গতি। প্রযুক্তি, যোগাযোগ, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং জীবনযাপনের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কিন্তু পরিবার, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানসিক অভিযোজনের কাঠামো সেই একই গতিতে বদলাতে পারছে না। ফলে একই পরিবারের ভেতরেও তৈরি হচ্ছে এক অদৃশ্য দূরত্ব।
আজকের তরুণ প্রজন্মের অনেকেই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের খবর মুহূর্তে জানতে পারে, অনলাইনে কাজ করতে পারে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে নতুন দক্ষতা অর্জন করতে পারে। কিন্তু সেই একই তরুণের বাবা হয়তো এমন এক সময়ে বড় হয়েছেন, যখন একটি চিঠি পৌঁছাতে সপ্তাহ লেগে যেত, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হতো, আর জীবনের স্থিতিশীলতাই ছিল সবচেয়ে বড় মূল্যবোধ।
এখানেই টানাপোড়েনের সূত্রপাত।
অনেক সময় আমরা এই পার্থক্যকে প্রজন্মগত সমস্যা বলে দেখি। মনে করি বাবা বুঝতে পারেন না, সন্তানও বুঝতে চায় না। কিন্তু বাস্তবতা আরও গভীর। একই সমাজে এখন একাধিক সময় পাশাপাশি অবস্থান করছে। একজন বাবা যে অভিজ্ঞতার পৃথিবীতে বড় হয়েছেন, তার সন্তান বড় হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতায়। ফলে একই ঘটনাকে তারা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন।
বাবা যখন নিরাপদ চাকরির কথা বলেন, সন্তান তখন নতুন সুযোগের কথা ভাবে। বাবা যখন স্থায়িত্ব চান, সন্তান তখন পরিবর্তনকে স্বাভাবিক মনে করে। বাবা যখন পারিবারিক বন্ধনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন, সন্তান তখন ব্যক্তিগত স্বপ্ন ও স্বাধীনতাকেও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।
এই পার্থক্যকে বিদ্রোহ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটাকে সময়ের পার্থক্য হিসেবে বুঝতে হবে।
কিন্তু এই বোঝাপড়ার দায় শুধু বাবা-মায়ের নয়, সন্তানেরও।
বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে পরিবারনির্ভর ছিল। বার্ধক্যের নিরাপত্তা, মানসিক আশ্রয়, অসুস্থতার সময়ে সহায়তা কিংবা জীবনের শেষ বয়সের সঙ্গ–সবকিছুর কেন্দ্র ছিল পরিবার। আমাদের বাবা-মা সেই বিশ্বাস নিয়েই জীবন কাটিয়েছেন যে, একদিন সন্তানরাই তাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হবে।
কিন্তু নগরায়ণ, কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষা এবং অভিবাসনের কারণে পরিবার এখন আর আগের মতো ভৌগোলিকভাবে একসঙ্গে নেই। সন্তান চাকরির জন্য ঢাকায়, বাবা-মা গ্রামের বাড়িতে। কেউ বিদেশে, কেউ অন্য শহরে। প্রযুক্তি যোগাযোগের সুযোগ বাড়িয়েছে, কিন্তু সহাবস্থানের অভাবও তৈরি করেছে।
ফলে বাবা-মায়ের জীবনে একটি নতুন ধরনের নিঃসঙ্গতা জন্ম নিচ্ছে।
অনেক সময় তারা অর্থের অভাবে নয়, মানুষের অভাবে কষ্ট পান। প্রয়োজনের অভাবে নয়, গুরুত্ব হারানোর অনুভূতিতে ভোগেন। তাদের সন্তান হয়তো নিয়মিত টাকা পাঠায়, কিন্তু মাসের পর মাস মন খুলে কথা বলে না। ওষুধের খরচ দেয়, কিন্তু এক কাপ চা নিয়ে পাশে বসে না। প্রযুক্তি দূরত্ব কমিয়েছে, কিন্তু সব সময় সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করতে পারেনি।
এই বাস্তবতায় বাবা দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়া উচিত দায়িত্বের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করা।
বর্তমান প্রজন্মের কর্তব্য শুধু অর্থনৈতিক সহায়তা নয়, মানসিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা। বাবা-মায়ের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান উপহার দামি কোনো বস্তু নয়, বরং সময়, মনোযোগ এবং সম্মান।
আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ আবার সম্পর্কনির্ভর হয়ে ওঠে। যে বাবা একসময় সন্তানের হাত ধরে রাস্তা পার করিয়েছেন, একসময় সেই বাবাই সন্তানের ফোনের অপেক্ষায় থাকেন। যে মানুষটি একসময় পরিবারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তিনিই একসময় পরিবারের আলোচনার বাইরে পড়ে যান।
এটা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটা একটি সামাজিক সংকট।
বর্তমান প্রজন্মের জন্য তাই কয়েকটি দায়িত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, নিয়মিত যোগাযোগকে অভ্যাসে পরিণত করা। ব্যস্ততার যুগে সময়ের অভাব বাস্তব, কিন্তু পাঁচ মিনিটের আন্তরিক কথোপকথনও অনেক সময় গভীর মানসিক শক্তি দেয়। প্রতিদিন না পারলেও নিয়মিত খোঁজ নেওয়া সম্পর্কের নিরাপত্তা তৈরি করে।
দ্বিতীয়ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বাবা-মাকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক মনে না করা। সময় বদলেছে, কিন্তু অভিজ্ঞতার মূল্য কমে যায়নি। প্রযুক্তিগত জ্ঞান হয়তো নতুন প্রজন্মের বেশি, কিন্তু জীবনের জ্ঞান এখনো প্রবীণদের কাছেই বেশি।
তৃতীয়ত, ডিজিটাল ব্যবধান কমানো। অনেক বাবা-মা প্রযুক্তির জগতে নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করেন। তাদের প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করা, অনলাইন সেবা ব্যবহারে সহায়তা করা কিংবা ধৈর্য নিয়ে শেখানোও এক ধরনের পারিবারিক দায়িত্ব।
চতুর্থত, বার্ধক্যকে পারিবারিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেমন পরিকল্পনা করা হয়, তেমনি বাবা-মায়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও সচেতন পরিকল্পনা প্রয়োজন। কারণ, দীর্ঘায়ুর যুগে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, আর পরিবারকে এই বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের বুঝতে হবে বাবা-মা কোনো অতীতের প্রতিনিধি নন, তারা আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। সময় বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে, পেশা বদলাবে, জীবনযাপনের ধরন বদলাবে, কিন্তু মানুষের মৌলিক প্রয়োজন–ভালোবাসা, সম্মান এবং আপনজনের উপস্থিতি কখনো বদলায় না।
বাবা দিবস তাই শুধু একজন বাবাকে শুভেচ্ছা জানানোর দিন নয়। এটা আমাদের সামাজিক বিবেককে প্রশ্ন করার দিন। আমরা কি এমন একটি সমাজ তৈরি করছি, যেখানে প্রবীণরা সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারবেন? আমরা কি এমন পরিবার গড়ে তুলছি, যেখানে প্রজন্মের পার্থক্য দূরত্বে নয়, সংলাপে রূপ নেবে?
পরিবর্তন অনিবার্য। জীবনও তাই। কিন্তু পরিবর্তনের এই দ্রুত সময়ে যদি আমরা বাবা-মায়ের হাত ছেড়ে দিই, তাহলে উন্নয়নের অনেক অর্জনও শেষ পর্যন্ত অপূর্ণ থেকে যাবে।
কারণ, একটি সমাজের প্রকৃত অগ্রগতি তার প্রযুক্তির গতি দিয়ে নয়, বরং সে তার প্রবীণ মানুষদের কতটা মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং ভালোবাসা দিতে পারে–সেই মানদণ্ডেই পরিমাপ করা হয়।
আজ বাবা দিবসে তাই সবচেয়ে বড় উপহার হতে পারে একটি ফোনকল, একটি দীর্ঘ আলাপ, একটি আন্তরিক কুশল জিজ্ঞাসা কিংবা একটি প্রতিশ্রুতি–সময়ের পরিবর্তন যত দ্রুতই হোক, বাবা-মা যেন কখনো নিজেদের অপ্রয়োজনীয় মনে না করেন।
লেখক: কথাসাহিত্যিক
