‘বাবা হলেন বটবৃক্ষ’-কথাটা ছোটবেলা থেকে শুনে আসলেও এর গভীরতা বোঝা আসলেই মুশকিল। বাবাদের ভালোবাসা তো আর দশটা ভালোবাসার মতো প্রকাশ্য নয়; তা লুকিয়ে থাকে শাসনের আড়ালে, নীরব ত্যাগে আর অতন্দ্র পাহারায়। আমার কাছে আমার বাবা কোনো সাধারণ মানুষ নন, তিনি আমার জীবনের আসল ‘সুপারহিরো’। আজ বিশ্ব বাবা দিবসে স্মৃতির জানলাটা খুলতেই একের পর এক ভেসে আসছে বাবার অবয়ব।
ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত আমার যত সাফল্য, যত অর্জন তার সবটুকুর কৃতিত্ব আমার বাবার। আমার ‘আমি’ হয়ে ওঠা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের এক ঐতিহ্যবাহী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতার মতো চ্যালেঞ্জিং বিষয়ে পড়াশোনা করা, কিংবা পরবর্তীতে এই রোমাঞ্চকর ও ঝুঁকিপূর্ণ সাংবাদিকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া সবকিছুর পেছনে আমার সবচেয়ে বড় শক্তি ও সমর্থক ছিলেন আমার বাবা।
সমাজ বা চারপাশের মানুষ যখন মেয়েদের চেনা গণ্ডির বাইরে যাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে, আমার বাবা তখন বরাবরের মতোই দৃঢ় কণ্ঠে বলেছেন, ‘আরে চেষ্টা করেই দেখ না, তুমি অবশ্যই পারবে!’ কখনো কোনো বিষয়ে তিনি আমাকে ‘না’ বলেননি, বরং শিখিয়েছেন কীভাবে প্রতিকূলতার মাঝেও একা পথ চলতে হয়।
নৈতিকতার পাঠশালা ও আদুরে ‘তামু’
বাবার কাছ থেকেই পেয়েছি নৈতিকতার প্রথম পাঠ। তিনি আমাকে স্পষ্টবাদী হতে শিখিয়েছেন। বাবা সবসময় একটা কথা বলেন, ‘তোমার বাবারও যদি কোনো ভুল হয়, তবে মেয়ে হিসেবে তা মনে করিয়ে দিতে কখনো দ্বিধাবোধ করবে না।’ এই এক লাইনের শিক্ষাই আমাকে আজ একজন সৎ ও নির্ভীক মানুষ হওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়।
পরিবারের ছোট মেয়ে হওয়ার সুবাদে বাবার সবচেয়ে বেশি আদর আমিই পেয়েছি। একদিকে যেমন ছিল তার কড়া শাসন, অন্যদিকে ছিল মাথায় তুলে নাচার মতো অপার স্বাধীনতা। তবে সময় তো আর একজায়গায় থমকে থাকে না। আজ থেকে বছর ছয়েক আগে পড়াশোনার তাগিদে এই অচেনা, ব্যস্ত শহর ঢাকায় যখন প্রথম পা রেখেছিলাম, তখনো আমার হাতটি শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন আমার বাবা।
রাগী মানুষটার চায়ের কাপে আড্ডা
বাহ্যিকভাবে আমার বাবা প্রচণ্ড রাগী। কিন্তু এই রাগী খোলসের নিচে যে কত কোমল আর মায়াবী একটা মন লুকিয়ে আছে, তা কেবল আমরাই জানি। আমাদের দুজনের সবচেয়ে প্রিয় সময় হলো চায়ের আসর। বাবা চা খেতে আর গল্প করতে ভীষণ ভালোবাসেন। অবাক করার মতো বিষয় হলো, বাবার এই চায়ের নেশা আর আড্ডা দেওয়ার অভ্যাসগুলো কখন যে অবিকল আমার ভেতরেও ‘ইনপুট’ হয়ে গেছে, তা আমি নিজেও টের পাইনি!
করোনাকালীনের একটা স্মৃতির কথা খুব মনে পড়ে। যখন সবকিছু স্থবির, অনলাইনে ক্লাস শুরু হলো, তখন আমার পড়াশোনার সুবিধার জন্য বাবা নিজে ঢাকা এসে আমাকে একটি ল্যাপটপ কিনে দিয়ে দেন। সন্তানের কোনো শখ বা প্রয়োজন বাবা কখনো অপূর্ণ রাখেননি।
দূরত্ব, ভিডিও কল এবং একটি অপ্রকাশিত ‘ভালোবাসা’
মাস্টার্স শেষ করে যখন সাংবাদিকতায় যোগ দিলাম, বাবার আনন্দের সীমা ছিল না। কিন্তু একই সঙ্গে তার মনে একটা চাপা কষ্টও ছিল, কারণ সাংবাদিকতা এমন এক পেশা যেখানে ছুটির বড় অভাব, চাইলেই হুট করে বাড়ি যাওয়া যায় না। এখন একদিনের ছুটিতে বাড়ি যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। সম্প্রতি বাবা বেশ অসুস্থ। বাড়িতে বাবা-মা দুজনেই একা থাকেন, কারণ ভাই-বোন সবাই আমরা নিজ নিজ গন্তব্যে ব্যস্ত। বাবার অসুস্থতার কথা শুনলে বুকটা কেঁপে ওঠে, ঢাকা শহরটাকে তখন বড্ড নিঃসঙ্গ মনে হয়।
কিছুদিন আগে বাবা কল দিয়ে বললেন, তিনি নিজেই ঢাকায় চলে আসবেন আমাকে দেখতে। আমি বারণ করে বললাম, ‘ঢাকায় যে গরম, ভালো মানুষও অসুস্থ হয়ে যাবে।’ আসলে গরমের চেয়েও তার অসুস্থ শরীর নিয়ে জার্নি করাটাই ছিল আমার মূল দুশ্চিন্তা। কিন্তু বাবার মন কি আর তা বোঝে? এখন প্রতিদিন নিয়ম করে বাবা আমাকে ভিডিও কল দেন, খোঁজ নেন। মুখ ফুটে কখনো বাবাকে বলা হয়নি ‘বাবা, তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি।’ কারণ আমার বাবা যেমন চাপা স্বভাবের, আমিও হয়তো বাবার মতোই একটু চাপা স্বভাবের হয়েছি।
বাবার স্বপ্ন এবং আমার আগামী
বাবার একটা মস্ত বড় স্বপ্ন আছে আমি উচ্চশিক্ষার জন্য একদিন বিদেশে যাব। পেশাগত ব্যস্ততার কারণে হয়তো এই স্বপ্ন পূরণে কিছুটা দেরি হচ্ছে, কিন্তু আমি জানি আমাকে লক্ষ্য মেটাতে হবে। বাবার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমি একজন পরোপকারী, স্পষ্টবাদী এবং সৎ মানুষ হিসেবে নিজের পরিচয় গড়তে চাই।
বাবা সবসময় আমাকে নিয়ে গর্ব করেন। তার এই গর্ব, এই বিশ্বাসই আমার পথচলার একমাত্র পাথেয়। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রতি ওয়াক্তের নামাজে আমার একটাই প্রার্থনা আমার বাবা যেন সুস্থ থাকেন, দীর্ঘজীবী হন। বাবার মুখের ওই অমলিন হাসিটুকু ধরে রাখার জন্য আমি আমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত চেষ্টা করে যাব। ইনশাল্লাহ, বাবার দেখা প্রতিটি স্বপ্ন আমি একদিন সত্যি করে তুলবোই।
শুভ বাবা দিবস, আমার সুপারহিরো! ইতি তোমার আদরের মেয়ে ‘তামু’।
