দেশে সড়ক ও ফুটপাত দখলের চিত্র নতুন নয়। তবে রাজধানী ঢাকার প্রধান সড়ক ও ফুটপাত এখন যেন দখলদারদের রাজ্যে পরিণত হয়েছে। অবৈধভাবে দোকানপাট গড়ে তোলা, গাড়ি পার্ক করা আর নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা- সব মিলিয়ে নগরবাসীর চলাচল দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। পথচারীরা বাধ্য হয়ে মূল সড়কে হাঁটছেন। এতে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে অজানা কারণে অভিযান প্রায় বন্ধ রয়েছে। এর সুযোগে দখলদারত্ব আরও বেড়ে গেছে।
তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত সিটি করপোরেশন বলছে, সংস্থাটির নিজস্ব পুলিশ না থাকায় চাঁদাবাজদের হাতে জিম্মি হচ্ছেন নগরবাসী। এ কারণে অভিযান চালালেও লাভ হচ্ছে না। প্রভাবশালীদের কাছে সিটি করপোরেশন একধরনের অসহায় হয়ে পড়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা এবং প্রভাবশালীদের প্রশ্রয়ে ফুটপাত ও সড়ক এখন ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী ও হকারদের দখলে। ফলে প্রতিদিনই শহরের বাসিন্দাদের দুর্ভোগ বাড়ছে। সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এ সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
তিন শিফটে দখল ব্যবসা
রাজধানীর ফুটপাত দখল করে ব্যবসা চলছে তিন শিফটে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এক দল, দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত আরেক দল এবং গভীর রাতের পর আরেক দল দখল নেয় সড়ক ও ফুটপাতের। এতে পথচারীদের হাঁটার জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়, অনেক ক্ষেত্রে পুরোপুরিই বন্ধ হয়ে যায়। কারওয়ান বাজার, মিরপুর, উত্তরা, গুলিস্তানসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়।
মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও ফার্মগেটে পুরো ফুটপাত দখলে চলে গেছে। কোথাও কোথাও দখল রাস্তায় গড়িয়েছে। গুলিস্তানে শুধু ফুটপাত নয়, পুরো সড়কই যেন অঘোষিত মার্কেট। নিউ মার্কেট এলাকার সড়ক দিন-রাত দখলে থাকে। দোকানপাট গড়ে তোলার পাশাপাশি অবৈধভাবে গাড়ি-মোটরসাইকেল পার্কিংও করা হচ্ছে।
পান্থপথ থেকে নিউ মার্কেট পর্যন্ত সড়কে সারা দিন যানজট লেগেই থাকে। কেননা সড়কের দুই পাশের ফুটপাতই দখল হয়ে আছে। দখল গড়িয়েছে সড়কেও। ওই সড়কের একটি বেসরকারি হাসপাতালের সামনের মূল সড়কে তিন-পাঁচ হাত দখল করে নতুন চায়ের দোকান দিয়েছেন চান মিয়া। তার দোকানে চা খাওয়ার ছলে জানতে চাই- ‘রাস্তার মধ্যে আপনার দোকান, কেউ কিছু বলে না? উত্তরে চান মিয়া বলেন, ‘কে কী বলবে? যারা বলবে তারাই তো টাকা নেয়!’ তিনি জানান, তাকে বেলা ২টার পর থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত দোকান চালানোর অনুমতি দেওয়া আছে। সকালে অন্যরা এখানে দোকান চালান।
ওই সড়কে এ রকম সারিবদ্ধ অসংখ্য দোকান দেখা গেছে।
কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের সামনের সবজি বিক্রেতা আজিজ জানান, তার সময় দেওয়া আছে ভোর থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত। এরপর অন্যরা তার স্থানে বসে দোকান চালান।
পথচারীদের দুর্ভোগ
ফুটপাত ব্যবহার করার সুযোগ না থাকায় সাধারণ মানুষকে বাধ্য হয়ে মূল সড়কে হাঁটতে হচ্ছে। এতে করে দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে তারা পড়ছেন। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি মারাত্মক। অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্স কিংবা জরুরি সেবামূলক যানবাহন ফুটপাত ও সড়ক দখলের কারণে আটকে যায়, যা প্রাণহানির মতো বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
শ্যামলী এলাকায় রোজিনা খাতুন নামের একজন পথচারী অভিযোগ করে বলেন, ‘ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সুযোগই নেই। বাচ্চাদের নিয়ে চলাচল করতে খুবই সমস্যা হয়। মাঝে মাঝে পুলিশ এসে দোকান উচ্ছেদ করে, কিন্তু পরে আবার হকাররা আগের জায়গায় ফিরে আসে।’
কারওয়ান বাজারের পিকআপচালক মাসুদ রানা বলেন, ‘অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে আমাদের গাড়ি চালাতে সমস্যা হয়। রাস্তা সরু হয়ে যায়, ফলে অল্প দূরত্ব পাড়ি দিতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যায়।’
হকাররা প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় অবৈধভাবে ফুটপাতে ব্যবসা চালানোর কারণে বৈধ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তারা দোকান ভাড়া, কর ও অন্যান্য খরচ মেটানোর পরও ক্রেতা হারাচ্ছেন। অন্যদিকে হকাররা ফুটপাত দখল করে তুলনামূলক কম খরচে ব্যবসা করছেন, ফলে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ও দোকানি আব্দুল মালেক বলেন, ‘আমরা দোকান ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করি। কিন্তু ফুটপাত দখল করে হকাররা কম দামে পণ্য বিক্রি করেন। এতে আমাদের বৈধ ব্যবসা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে।’
সড়ক যেন যানবাহনের পার্কিং ও রিকশাস্ট্যান্ড
ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা- মিরপুর, কল্যাণপুর, মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, গুলিস্তান, পল্টন ও পান্থপথে অবৈধভাবে ট্রাক, পিকআপ, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন পার্ক করা হয়। কোথাও কোথাও রিকশাস্ট্যান্ডও গড়ে উঠেছে। এমনকি ফুটপাতের ওপরেই গাড়ি মেরামতের কাজ করা হয়। এতে পথচারীদের চলাচলে চরম ভোগান্তি তৈরি হয়।
নগরের ছোট-বড় প্রায় প্রতিটি হাসপাতালের সামনে সড়ক দখল করে অবৈধভাবে অ্যাম্বুলেন্স ও গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবসা চলছে। গাড়ি পার্ক করার জন্য আলাদা টাকা দিতে হয় স্থানীয় দখলদারদের। আবার সেখানে অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের সমিতিও রয়েছে। হাসপাতালের রোগীদের তাদের বাহনে করে নিয়ে যেতে হয়। এই পুরো কার্যক্রমটিই হচ্ছে জনগণের টাকায় তৈরি সরকারি সড়কে।
ফুটপাত ও সড়কে ইট, বালু, রড, সিমেন্ট
বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে ইট, বালু, রড ও অন্যান্য সামগ্রী রেখে ব্যবসা করতে দেখা গেছে। কাজটি বেআইনি হলেও নির্মাণসামগ্রী রাস্তার ওপর রাখা একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাঁঠালবাগানের ঢালে এমন চিত্র দেখা যায়। পুরোনো ইট, বালু ও খোয়ার ব্যবসা চলছে সেখানে। অনেকে আবার অস্থায়ী বাসস্থান গড়তে ফুটপাতকেই বেছে নিয়েছেন।
যানজটে নাকাল নগরবাসী
সড়ক দখল করে দোকানপাট বসানো এবং অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে অফিস সময় এবং শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরুর সময়ে এ সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে। রাজধানীর মানুষ প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তার যানজটে বসে থাকছেন।
ঢাকা কলেজ এলাকায় কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী শারমিন আক্তার বলেন, ‘ক্লাসে যেতে হলে প্রতিদিন ভোগান্তি পোহাতে হয়। ফুটপাত হকারদের দখলে থাকে, ফলে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে হয়। অনেক সময় ঠিক সময়ে কলেজে পৌঁছানো যায় না।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদারকির অভাব, রয়েছে রাজনৈতিক ইন্ধন
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং কিছু প্রভাবশালী মহলের কারণে ফুটপাত ও সড়ক দখল হয়ে আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। দেখেও তারা না দেখার ভান করেন। নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা হয় না। দু-এক জায়গায় অভিযান চালালেও কয়েক দিনের মধ্যেই আবার হকার ও দখলদাররা আগের অবস্থানে ফিরে আসেন।
চাঁদাবাজদের হাতে নগরবাসী জিম্মি বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের নিজস্ব পুলিশ নেই। পুলিশ না থাকায় ঢাকাবাসী চাঁদাবাজদের হাতে জিম্মি হয়ে আছে। আমরা মাঝে মাঝেই অভিযান চালাই, কিন্তু প্রভাবশালী চাঁদাবাজদের কারণে সড়ক ও ফুটপাত আবারও দখলে চলে যায়।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শাহজাহান মিয়া বলেছেন, ‘যেখানে প্রয়োজন আমরা সেখানে অভিযান চালাচ্ছি। সবখানে একসঙ্গে চালানো যায় না। বিভিন্ন বিষয় থাকে।’
সমন্বিত উদ্যোগের দাবি
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শহরের সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে একক কোনো সংস্থার প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। সিটি করপোরেশন, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। অন্যথায় রাজধানীবাসীর ভোগান্তি কোনোভাবেই কমবে না।
সড়ক দখলের কারণে ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম কিছুদিন বন্ধ থাকলেও পরবর্তী সময়ে সড়ক ও ফুটপাতে তুলানামূলক দখল বেড়েছে। রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী চক্র পতিত সরকারের মতো ফুটপাতকে তাদের আয়ের উৎস বানিয়ে নিয়েছে। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা এবং রাজনৈতিক যোগসাজশ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি আরও বলেন, ‘এমনিতেই আমাদের ঢাকা শহরে প্রয়োজনের তুলনায় রাস্তা রয়েছে তিন ভাগের এক ভাগ। সেই এক ভাগের বেশির ভাগটাই যদি দখলে থাকে তাহলে আমাদের সাধারণ মানুষের চলাচলের ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিপদ নেমে আসে। মানুষ ফুটপাত ছেড়ে রাস্তায় হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে, ফলে বাড়ছে দুর্ঘটনা। এ ব্যাপারে সরকারের বলিষ্ঠ ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। দখলদার চক্র- যারা রাস্তা দখল করে অবৈধ আয় করে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন।’