জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে করা মামলায় চতুর্থ দিনের যুক্তিতর্কে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথনে প্রমাণ হয়েছে যে, হেলিকপ্টার থেকে গুলি করার নির্দেশ তিনি দিয়েছেন।’
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ বুধবার (১৫ অক্টোবর) চতুর্থ দিনে প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
তাজুল ইসলাম বলেন, “মোবাইল ফোনে হাসানুল হক ইনু, শেখ ফজলে নূর তাপস ও এস এম মাকসুদ কামালের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথনের মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হয়েছে তিনি (শেখ হাসিনা) দেশব্যাপী ‘ওয়াইডস্প্রেড’ ও ‘সিস্টেমেটিক’ হামলার নির্দেশ দেন। ড্রোন ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের অবস্থান শনাক্ত করে হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে কথোপকথনে শেখ হাসিনা নিশ্চিত করেন, নারায়ণগঞ্জে হেলিকপ্টার থেকে বোমা হামলা চালানো হবে এবং প্যারাট্রুপস নামানো হবে। সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর কাছ থেকে আমরা ‘ডিটেইলড ফ্লাইট চার্টার’ সংগ্রহ করেছি। কতক্ষণ ফ্লাইট চলেছে, কোন পাইলট পরিচালনা করেছেন, তাদের নাম, ফোন নম্বরসহ সব তথ্য দেখিয়েছি। কারা যাত্রী ছিলেন, কী কী অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে, কত রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়েছে। এসএমজি, লাইট মেশিনগান, শটগান, রাইফেল, সাউন্ড গ্রেনেড, স্টান গ্রেনেডসহ সব অস্ত্রের হিসাব দাখিল করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ, আহত ও নিহতদের শরীর থেকে উদ্ধার করা বুলেটসহ সব প্রমাণ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে।”
গত মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার কথোপকথনের যে তিনটি অডিও শোনানো হয়েছে, সেই অডিওতে কণ্ঠস্বর শেখ হাসিনার কি না? এমন প্রশ্নের উত্তরে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষায় নিশ্চিত করা হয়েছে, এটি শেখ হাসিনারই কণ্ঠ। শেখ ফজলে নূর তাপস, হাসানুল হক ইনু এবং এস এম মাকসুদ কামালের কণ্ঠও তারা নিশ্চিত করেছে। সিআইডি বলেছে, ওই কথোপকথন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি নয়। বাংলাদেশের বাইরের দুটি প্রতিষ্ঠান- বিবিসি ও আল-জাজিরাও কণ্ঠস্বর বিশ্লেষণ করেছে। বিবিসির নিজস্ব একটি প্রতিষ্ঠান তাদের পরীক্ষায় নিশ্চিত করেছে- এটি শেখ হাসিনার কণ্ঠ, এআই দিয়ে করা নয়।’
তাজুল ইসলাম বলেছেন, ‘কথোপকথনে প্রমাণ হয়েছে যে, হত্যার নির্দেশ সত্যিকার অর্থেই শেখ হাসিনার কাছ থেকে এসেছে। তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনও ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ তিনি পেয়েছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ নির্দেশ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে টেলিফোনে জানান। এরপর ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিব, প্রলয় জোয়ার্দারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ওয়্যারলেস মেসেজের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে নির্দেশ পৌঁছে দেন। এই কমান্ড বা হুকুমের প্রেক্ষিতে মারণাস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের যে প্রমাণ পাওয়া গেছে, তা আমরা লাইভ উইটনেস, ডকুমেন্টারি এভিডেন্স, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন ও ভিডিও ফুটেজ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেছি। এতটাই অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে যে, এই মামলা শুধু বাংলাদেশের আদালতেই নয়, আন্তর্জাতিক যেকোনো আদালতেও অপরাধ প্রমাণিত হবে। এ নির্দেশ সুনির্দিষ্টভাবে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে এসেছে এবং তা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এ অপরাধগুলো ছিল ওয়াইডস্প্রেড ও সিস্টেমেটিক, যা আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।’
তাজুল ইসলাম আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনার হুকুম থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন এবং তার ফলাফল- সবকিছুর একটি পূর্ণাঙ্গ চেইন অব কমান্ডের প্রমাণসহ আমরা দেখিয়েছি। নিহতদের দেহ থেকে উদ্ধার বুলেট কোন অস্ত্র থেকে এসেছে, কারা তা ব্যবহার করেছে- সবকিছুর অকাট্য প্রমাণ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে।’
এ মামলায় শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে গত ১০ জুলাই অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। অভিযোগ গঠনের দিন নিজের দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) হওয়ার আবেদন করেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। সত্য ঘটনা প্রকাশ করার শর্তে মামুনকে রাজসাক্ষী হিসেবে ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল। যদিও জুলাই আন্দোলনে বিভিন্ন হত্যার মামলায় তিনি আগে থেকেই কারাবন্দি আছেন। রাজসাক্ষী হিসেবে ঘোষণার পর থেকে তিনি রাজসাক্ষীর মর্যাদায় কারাগারেই আছেন। প্রতি ধার্যদিনে তাকে কারাগার থেকে এনে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। বুধবারও তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিল।